পশ্চিম মেদিনীপুরে ভয়াবহ বন্যা, জলবন্দি হাজার হাজার মানুষ, বিপর্যস্ত জনজীবন

- Advertisement -

পশ্চিম মেদিনীপুরে টানা বৃষ্টি ও নদীর জলস্তর বৃদ্ধিতে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সবং, নারায়ণগড়, মোহনপুর, দাঁতন ও কেশিয়াড়ির বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত। জলবন্দি হাজার হাজার মানুষ। ডুবে গিয়েছে বহু রাস্তা ও কৃষিজমি। সবংয়ে তিন বছরের শিশুসহ দু’জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে চলছে উদ্ধার ও ত্রাণকাজ। পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে জেলা প্রশাসন।

পশ্চিম মেদিনীপুরে ভয়াবহ বন্যা, জলবন্দি হাজার হাজার মানুষ, বিপর্যস্ত জনজীবন
Symbolic Image

টানা বৃষ্টি এবং একাধিক নদীর জলস্তর বৃদ্ধিতে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে পশ্চিম মেদিনীপুরে। জেলার সবং, নারায়ণগড়, মোহনপুর, দাঁতন এবং কেশিয়াড়ি-সহ বিস্তীর্ণ এলাকার বহু গ্রাম এখন জলের তলায়। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সবংকে ঘিরে। প্রশাসন সূত্রে খবর, সবং ব্লকের ১৩টি গ্রাম পঞ্চায়েতেরই কমবেশি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ জলবন্দি হয়ে পড়েছেন।

বন্যা পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসছে কেলেঘাই ও সুবর্ণরেখা নদীর জলস্তর বৃদ্ধি। টানা বৃষ্টির জেরে নদীগুলিতে জল বাড়তে থাকায় নদী তীরবর্তী বহু এলাকায় জল ঢুকে পড়েছে। কোথাও হাঁটুসমান, আবার কোথাও কোমরসমান জল দাঁড়িয়ে রয়েছে। রাস্তা, চাষের জমি এবং বসতবাড়ির একাংশ জলের তলায় চলে যাওয়ায় স্বাভাবিক জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত।

সবংয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ

সবং ব্লকের পরিস্থিতি প্রশাসনের কাছে বিশেষভাবে চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৩টি গ্রাম পঞ্চায়েতের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার জল ঢুকে পড়ায় বহু পরিবার সমস্যায় পড়েছে। অনেক জায়গায় সাধারণ যাতায়াত ব্যাহত হয়েছে। কোথাও রাস্তার উপর দিয়ে জল বইছে, আবার কোথাও জলমগ্ন রাস্তার কারণে গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

বন্যার মধ্যে সবংয়ে পৃথক ঘটনায় তিন বছরের এক শিশুসহ দু’জনের জলে ডুবে মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। ফলে জলবন্দি মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

জলমগ্ন চাষের জমি, আশঙ্কায় কৃষক

বন্যার জলে পশ্চিম মেদিনীপুরের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ডুবে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। ইতিমধ্যেই বহু জায়গায় ধান ও অন্যান্য ফসলের জমি জলের তলায় চলে গিয়েছে। জল কতদিন জমে থাকবে, তার উপর ফসলের ক্ষতির পরিমাণ অনেকটাই নির্ভর করবে। তবে এই মুহূর্তে জেলার মোট কৃষিক্ষতির নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রশাসনের তরফে জানানো হয়নি।

জলের তলায় চলে যাওয়া রাস্তা ও কৃষিজমির ছবি বিভিন্ন জায়গা থেকে সামনে এসেছে। বিশেষ করে কেলেঘাই নদীর জলস্তর বৃদ্ধির ফলে সবং, নারায়ণগড়, কেশিয়াড়ি-সহ নদী সংলগ্ন এলাকার পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হয়েছে।

বিপর্যস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা

বন্যার জল ঢুকে পড়ায় বেশ কিছু এলাকায় রাস্তাঘাটের উপর প্রভাব পড়েছে। জলমগ্ন রাস্তা দিয়ে যান চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে দুর্গত মানুষের কাছে খাবার, পানীয় জল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়াও প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

প্রয়োজনে নৌকা ও ট্রাক্টর ব্যবহার করে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে। শুকনো খাবার, রান্না করা খাবার, পানীয় জল এবং ত্রিপল সরবরাহের কাজ চলছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী উদ্ধার ও ত্রাণকাজ আরও বাড়ানোর প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে।

পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর মিলিয়ে ব্যাপক বন্যা

শুধু পশ্চিম মেদিনীপুর নয়, পূর্ব মেদিনীপুরের বিস্তীর্ণ এলাকাতেও বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিয়েছে। দুই মেদিনীপুর মিলিয়ে প্রায় ১,৬০০টি গ্রাম জলমগ্ন হয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। বহু মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে ত্রাণশিবিরে রাখা হয়েছে।

পূর্ব মেদিনীপুরের হলদিয়া, নন্দীগ্রাম, চণ্ডীপুর, ময়না, ভগবানপুর এবং পটাশপুরেও জল ঢুকেছে। বেশ কিছু রাস্তা ও বাজার জলের তলায় চলে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। কেলেঘাই নদীর জলস্তর বৃদ্ধি দুই মেদিনীপুরের একাধিক এলাকার জন্যই নতুন আশঙ্কা তৈরি করেছে।

প্রশাসনের তৎপরতা

পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলা প্রশাসনের আধিকারিকরা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছেন। দুর্গত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি জলবন্দি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। নৌকা ও অন্যান্য যানবাহন ব্যবহার করে দুর্গম এলাকায় পৌঁছনোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

বন্যা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে বৃহস্পতিবার সবংয়ের দুর্গত এলাকা পরিদর্শনের কথা রয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি প্রশাসনিক আধিকারিকদের সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করার কথা। এই পরিদর্শনের পর ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসন নিয়ে আরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

এখনও কাটেনি আশঙ্কা

সবচেয়ে বড় আশঙ্কা নদীর জলস্তর নিয়ে। নতুন করে ভারী বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। নদীর জলস্তর বাড়ার পাশাপাশি দুর্বল বাঁধ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ফলে প্রশাসনের নজর এখন নদী ও বাঁধ সংলগ্ন এলাকাগুলির দিকে।

এই মুহূর্তে দুর্গত মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নিরাপদ আশ্রয়, পানীয় জল, খাবার এবং চিকিৎসা পরিষেবা। বন্যার জল নামার পর প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র আরও স্পষ্ট হবে। বিশেষ করে কৃষি, রাস্তা, বাড়িঘর ও স্থানীয় পরিকাঠামোয় কতটা ক্ষতি হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব পেতে আরও সময় লাগবে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই কঠিন সময়ে প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষও উদ্ধার ও ত্রাণকাজে একে অপরের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। তবে বৃষ্টি ও নদীর জলস্তর স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পশ্চিম মেদিনীপুরের বিস্তীর্ণ এলাকায় উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -