ভারতের সংসদ ‘বন্দে মাতরম’-কে জাতীয় সঙ্গীত ‘জন গণ মন’-এর সমতুল্য আইনি সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে সংশোধনী বিল পাস করেছে। রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর এটি আইনে পরিণত হবে। সরকারের দাবি, জাতীয় গানের মর্যাদা রক্ষাই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য। বিরোধী দলগুলোর একাংশ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

ভারতের সংসদ ‘বন্দে মাতরম’-কে জাতীয় সঙ্গীত ‘জন গণ মন’-এর সমতুল্য আইনি সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে Prevention of Insults to National Honour (Amendment) Bill, 2026 পাস করেছে। রাজ্যসভায় অনুমোদনের পর লোকসভাতেও বিলটি পাস হওয়ায় এটি এখন রাষ্ট্রপতির সম্মতির অপেক্ষায় রয়েছে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন এবং সরকারি গেজেটে প্রকাশের পরই সংশোধনীটি কার্যকর আইনে পরিণত হবে।
এই সংশোধনীকে কেন্দ্র সরকার জাতীয় প্রতীকের মর্যাদা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর একাংশ আইনটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও জাতীয় গানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অস্বীকার করেনি। তাদের মূল উদ্বেগ ছিল আইনটির প্রয়োগ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা।
বিলে কী বলা হয়েছে?
বর্তমানে Prevention of Insults to National Honour Act, 1971-এর অধীনে জাতীয় পতাকা, সংবিধান এবং জাতীয় সঙ্গীতের অবমাননা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে সেই আইনি সুরক্ষার আওতায় জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম’-কেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এর অর্থ, ইচ্ছাকৃতভাবে ‘বন্দে মাতরম’-এর অবমাননা বা অসম্মানজনক আচরণ করলে তা সংশোধিত আইনের আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। সংসদে বিলটি পাস হলেও এটি এখনও কার্যকর হয়নি; কার্যকর হওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতির সম্মতি আবশ্যক।
সরকারের অবস্থান
লোকসভায় বিলটি উপস্থাপনকালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই বলেন, ‘বন্দে মাতরম’ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এবং বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী এই গান থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। সরকারের মতে, জাতীয় গানের মর্যাদা রক্ষায় আইনি সুরক্ষা প্রদান দেশের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অংশ।
সরকার আরও জানায়, এই আইন সাধারণ আলোচনা, গবেষণা, ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ বা সাংস্কৃতিক বিতর্কের বিরুদ্ধে নয়; বরং কেবল ইচ্ছাকৃত অবমাননাকর কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে।
সংসদে বিতর্ক
লোকসভায় বিলটি নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়। ডিএমকে-সহ কয়েকটি বিরোধী দল বিলটির বিরোধিতা করে। তাদের বক্তব্য, জাতীয় প্রতীকের প্রতি সম্মান অবশ্যই থাকা উচিত, তবে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে যেন মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
অন্যদিকে শাসকদল যুক্তি দেয়, জাতীয় প্রতীক ও জাতীয় গানের মর্যাদা রক্ষার জন্য স্পষ্ট আইনি কাঠামো থাকা প্রয়োজন এবং সংশোধনী সেই উদ্দেশ্যেই আনা হয়েছে।
‘বন্দে মাতরম’-এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’-এ প্রথম প্রকাশিত হয় ‘বন্দে মাতরম’। পরে এটি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দেশাত্মবোধক গান হয়ে ওঠে। স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ে এই গান আন্দোলনকারীদের অনুপ্রাণিত করেছে।
১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি গণপরিষদ ‘জন গণ মন’-কে জাতীয় সঙ্গীত এবং ‘বন্দে মাতরম’-কে জাতীয় গান হিসেবে বিশেষ মর্যাদা প্রদান করে। নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে সেই ঐতিহাসিক মর্যাদার সঙ্গে আইনি সুরক্ষাও যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আইন কার্যকর হতে কী বাকি?
সংসদের উভয় কক্ষে বিলটি পাস হওয়ায় এখন এটি রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হলে সংশোধনী কার্যকর হবে এবং সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো নতুন বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গি
সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় প্রতীকের মর্যাদা রক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলেও আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংবিধানের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রদত্ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে আদালত এই আইনের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য
বিলটি শুধু একটি আইনি সংশোধনী নয়; এটি ভারতের জাতীয় পরিচয়, স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ঘিরে চলমান রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনাকেও নতুন মাত্রা দিয়েছে। সমর্থকদের মতে, জাতীয় গানের মর্যাদা রক্ষায় এটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। সমালোচকদের মতে, আইনের প্রয়োগে স্বচ্ছতা ও সংযম নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর আইনটি কার্যকর হলে এর বাস্তব প্রয়োগ এবং বিচারিক ব্যাখ্যা আগামী দিনে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

