সম্প্রতি জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সৌরজগতের বাইরের প্রথম শক্তিশালী সম্ভাব্য উপগ্রহ বা এক্সোস্যাটেলাইটের সন্ধান পেয়েছেন। বস্তুটি একটি ব্রাউন ডোয়ার্ফকে প্রদক্ষিণ করছে, যা আবার একটি লাল বামন নক্ষত্রের চারদিকে ঘোরে। এই আবিষ্কার গ্রহীয় ব্যবস্থার গঠন, উপগ্রহের উৎপত্তি এবং মহাবিশ্বে নতুন ধরনের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বস্তুর অস্তিত্ব সম্পর্কে গবেষণায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের অন্যতম বড় লক্ষ্য ছিল সৌরজগতের বাইরে থাকা কোনও গ্রহের উপগ্রহ বা ‘এক্সোমুন’ (Exomoon)-এর অস্তিত্ব নিশ্চিত করা। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে হাজার হাজার বহির্গ্রহ (Exoplanet) শনাক্ত হলেও তাদের চারপাশে ঘুরতে থাকা কোনও উপগ্রহের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটতে পারে সাম্প্রতিক এক যুগান্তকারী আবিষ্কারের মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক গবেষকদের একটি দল এমন একটি বস্তুর সন্ধান পেয়েছেন, যেটিকে এখন পর্যন্ত সৌরজগতের বাইরের প্রথম শক্তিশালী ‘এক্সোমুন’ বা আরও নির্ভুলভাবে ‘এক্সোস্যাটেলাইট’ (Exosatellite) হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
গবেষণাটি সম্প্রতি বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বিজ্ঞান সাময়িকী Nature-এ প্রকাশিত হয়েছে। এতে গবেষকেরা জানিয়েছেন, নতুন আবিষ্কৃত বস্তুটি সরাসরি কোনও নক্ষত্রকে নয়, বরং একটি ব্রাউন ডোয়ার্ফ বা বাদামি বামনকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণ করছে। এই কারণেই এটিকে প্রচলিত অর্থে ‘চাঁদ’ বলা উচিত কি না, তা নিয়ে ইতোমধ্যে বৈজ্ঞানিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
কোথায় মিলেছে এই অদ্ভুত জগত?
গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে CD-35 2722 নামে একটি নক্ষত্র ব্যবস্থা, যা পৃথিবী থেকে প্রায় ৭১–৭৩ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এই ব্যবস্থায় একটি লাল বামন নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরছে CD-35 2722 B নামে একটি ব্রাউন ডোয়ার্ফ। নতুন আবিষ্কৃত বস্তুটি আবার সেই ব্রাউন ডোয়ার্ফকে প্রদক্ষিণ করছে। অর্থাৎ এটি একটি তিন-স্তরবিশিষ্ট কক্ষপথের উদাহরণ — নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে ব্রাউন ডোয়ার্ফ, আর ব্রাউন ডোয়ার্ফকে প্রদক্ষিণ করছে সম্ভাব্য উপগ্রহ।
বিজ্ঞানীদের মতে, এমন জটিল কক্ষপথের ব্যবস্থা আগে নিশ্চিতভাবে দেখা যায়নি। তাই এই আবিষ্কার শুধু নতুন একটি মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধানই নয়, বরং গ্রহীয় ব্যবস্থার গঠন ও বিবর্তন সম্পর্কে বিদ্যমান ধারণাকেও নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে।
কীভাবে মিলল সন্ধান?
গবেষণায় ইউরোপিয়ান সাউদার্ন অবজারভেটরির (ESO) চিলিভিত্তিক Very Large Telescope (VLT) এবং এর উচ্চ-নির্ভুলতার CRIRES + স্পেকট্রোগ্রাফ ব্যবহার করা হয়েছে। গবেষকেরা ‘রেডিয়াল ভেলোসিটি’ পদ্ধতির মাধ্যমে ব্রাউন ডোয়ার্ফটির সূক্ষ্ম দোলন বিশ্লেষণ করেন। কোনও বৃহৎ বস্তু তার চারপাশে প্রদক্ষিণ করলে মহাকর্ষীয় আকর্ষণের কারণে মূল বস্তুর অবস্থানে সামান্য পরিবর্তন ঘটে। সেই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করেই সম্ভাব্য উপগ্রহটির অস্তিত্বের শক্তিশালী প্রমাণ মিলেছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নতুন বস্তুটির সর্বনিম্ন ভর বৃহস্পতির প্রায় ০.৭৪ গুণ এবং এটি প্রায় ১৬৯–১৭০ দিনে একবার ব্রাউন ডোয়ার্ফকে প্রদক্ষিণ করে। গবেষণায় আরও একটি ছোট সম্ভাব্য উপগ্রহের ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে, যদিও সেটির অস্তিত্ব এখনও নিশ্চিত নয়।
কেন একে ‘চাঁদ’ বলা নিয়ে বিতর্ক?
আমাদের সৌরজগতের সব প্রাকৃতিক উপগ্রহ কোনও না কোনও গ্রহকে কেন্দ্র করে ঘোরে। কিন্তু এই নতুন বস্তুটি যে বস্তুকে কেন্দ্র করে ঘুরছে, সেটি একটি ব্রাউন ডোয়ার্ফ। ব্রাউন ডোয়ার্ফকে সম্পূর্ণ গ্রহও বলা যায় না, আবার নক্ষত্রও নয়। এর ভর গ্রহের চেয়ে বেশি হলেও নক্ষত্রের মতো হাইড্রোজেন ফিউশন চালিয়ে যেতে পারে না। ফলে এর চারপাশে ঘুরতে থাকা বস্তুকে ‘চাঁদ’ নাকি অন্য কোনও নামে ডাকা হবে, তা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এই কারণেই গবেষকেরা ‘Exomoon’-এর পাশাপাশি ‘Exosatellite’ শব্দটিও ব্যবহার করছেন। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়ন (IAU) এ ধরনের বস্তুর জন্য নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এত গুরুত্বপূর্ণ কেন এই আবিষ্কার?
বর্তমানে ৬ হাজারেরও বেশি বহির্গ্রহের অস্তিত্ব নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু এতদিন কোনও উপগ্রহের উপস্থিতি নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা যায়নি। কারণ, গ্রহের তুলনায় উপগ্রহ অনেক ছোট এবং তাদের সনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। এই নতুন গবেষণা দেখিয়ে দিল, উন্নত পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবিষ্যতে আরও এক্সোমুন বা এক্সোস্যাটেলাইট আবিষ্কার করা সম্ভব হতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, উপগ্রহের উপস্থিতি শুধু একটি নতুন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বস্তু শনাক্ত করার বিষয় নয়। এগুলোর মাধ্যমে বোঝা যায় কোনও গ্রহীয় ব্যবস্থা কীভাবে তৈরি হয়েছে, সময়ের সঙ্গে কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে এবং সেখানে জীবনের জন্য উপযোগী পরিবেশ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে কি না।
ভবিষ্যতের গবেষণায় কী অপেক্ষা করছে?
গবেষকেরা এখন আরও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই আবিষ্কারকে শক্তিশালী করতে চান। ভবিষ্যতে ইউরোপিয়ান সাউদার্ন অবজারভেটরির নির্মাণাধীন Extremely Large Telescope (ELT) এবং অন্যান্য অত্যাধুনিক পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে একই ধরনের আরও বস্তু খোঁজা হবে। বিজ্ঞানীদের আশা, নতুন প্রজন্মের দূরবীক্ষণ যন্ত্র মহাবিশ্বে লুকিয়ে থাকা আরও বহু উপগ্রহের সন্ধান দেবে এবং গ্রহ, উপগ্রহ ও ব্রাউন ডোয়ার্ফের মধ্যকার সম্পর্ক সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
এই আবিষ্কার তাই শুধু একটি নতুন মহাজাগতিক বস্তুর খোঁজ নয়; বরং এটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের এমন একটি অধ্যায়ের সূচনা, যা ভবিষ্যতে আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে প্রচলিত অনেক ধারণাই বদলে দিতে পারে।

