প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উজবেকিস্তান সফরে ভারত ও উজবেকিস্তানের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। দুই দেশ ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে বাণিজ্য ৫০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি ইউরেনিয়াম সরবরাহ, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, ডিজিটাল পেমেন্ট, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই সফর ভারতের মধ্য এশিয়া নীতিতেও নতুন গতি আনতে পারে।

মধ্য এশিয়ায় ভারতের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উজবেকিস্তান সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২৯ ও ৩০ আগস্টের এই সরকারি সফরে ভারতের সঙ্গে উজবেকিস্তানের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার একাধিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। দুই দেশ তাদের বিদ্যমান কৌশলগত অংশীদারিত্বকে ‘Comprehensive Strategic Partnership’ বা ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা হয়েছে।
উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শাভকাত মির্জিয়োয়েভের আমন্ত্রণে তাশখন্দ সফরে যান প্রধানমন্ত্রী মোদী। দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জ্বালানি, পরিকাঠামো, ডিজিটাল প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা, নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ-সহ একাধিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। ভারতের পক্ষ থেকে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে আরও গভীর করার ক্ষেত্রে উজবেকিস্তানকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কৌশলগত অংশীদারিত্বে বড় পরিবর্তন
সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফলাফলগুলির মধ্যে রয়েছে ভারত-উজবেকিস্তান সম্পর্ককে ‘Comprehensive Strategic Partnership’-এর পর্যায়ে উন্নীত করা। এর ফলে দুই দেশের সহযোগিতা শুধু রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, জ্বালানি এবং জনসম্পর্কের মতো একাধিক ক্ষেত্রে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে পারে।
দুই দেশের মধ্যে এই নতুন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য বিদেশমন্ত্রীদের নেতৃত্বে একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং আন্তঃসরকারি কমিশনকে মন্ত্রী পর্যায়ে উন্নীত করার বিষয়েও ঐকমত্য হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আরও নিয়মিত ও উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইউরেনিয়াম সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি
সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জ্বালানি নিরাপত্তা। ভারত ও উজবেকিস্তান দীর্ঘমেয়াদি ইউরেনিয়াম সরবরাহের ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অগ্রগতি করেছে। ভারতের ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচির জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে উজবেকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ইউরেনিয়াম সহযোগিতা ভারতের জ্বালানি কৌশলের দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
শুধু ইউরেনিয়াম নয়, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ বা ‘Critical Minerals’ ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, আধুনিক প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য এই ধরনের খনিজের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। তাই উজবেকিস্তানের খনিজ সম্পদ এবং ভারতের শিল্প ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ কোটি ডলারের বাণিজ্য
অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার লক্ষ্যও স্পষ্ট হয়েছে মোদীর সফরে। দুই দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বর্তমানে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ এই লক্ষ্যের তুলনায় অনেক কম। ফলে আগামী কয়েক বছরে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে দুই দেশকেই।
পরিকাঠামো, ডিজিটাল অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, কৃষি, ওষুধ, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য শিল্পক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে এই বাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। দুই দেশের ব্যবসায়ী মহলের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
উজবেকিস্তানে ভারতীয় UPI-এর প্রবেশ
ডিজিটাল অর্থনীতির ক্ষেত্রেও সফরটি গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের UPI ব্যবস্থাকে উজবেকিস্তানে আরও কার্যকর করার জন্য NPCI International Payments Limited এবং উজবেকিস্তানের National Interbank Processing Centre-এর মধ্যে বাণিজ্যিক চুক্তি হয়েছে।
এর ফলে ভারতীয় UPI অ্যাপ ব্যবহার করে উজবেকিস্তানের নির্দিষ্ট ব্যবসায়ীদের কাছে পেমেন্ট করার সুযোগ তৈরি হবে। ভারতীয় ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার আন্তর্জাতিক প্রসারের ক্ষেত্রে এটি একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ।
ভারত দীর্ঘদিন ধরেই তার ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচারের আন্তর্জাতিক ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করছে। উজবেকিস্তানে UPI-ভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রসার সেই বৃহত্তর উদ্যোগেরই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নিরাপত্তা ও মধ্য এশিয়ায় ভারতের ভূমিকা
উজবেকিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থানও এই সফরের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। মধ্য এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলির মধ্যে উজবেকিস্তানের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আফগানিস্তানের পরিস্থিতি, সন্ত্রাসবাদ, উগ্রপন্থা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার মতো বিষয় ভারত ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত দীর্ঘদিন ধরে ‘Connect Central Asia’ নীতির মাধ্যমে এই অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে। সেই প্রেক্ষাপটে উজবেকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন স্তর ভারতের মধ্য এশিয়া নীতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
বিশেষ করে বাণিজ্যিক যোগাযোগ ও পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগোলিকভাবে মধ্য এশিয়া ভারতের কাছ থেকে সরাসরি বিচ্ছিন্ন হওয়ায় বিকল্প যোগাযোগপথ এবং আঞ্চলিক অংশীদারিত্বের গুরুত্ব রয়েছে।
শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক
সফরে শুধু অর্থনীতি ও কৌশলগত বিষয় নয়, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দুই দেশ শিক্ষা ও যুব বিনিময় বাড়ানোর পাশাপাশি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে আরও জোরদার করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
উজবেকিস্তানে ভারতের প্রাচীন সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধ ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন স্থানের সংরক্ষণেও সহযোগিতার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ভারত ও মধ্য এশিয়ার মধ্যে বহু শতাব্দী ধরে বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও জ্ঞান-বিনিময়ের সম্পর্ক রয়েছে। সেই ঐতিহাসিক যোগাযোগকে আধুনিক কূটনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা এই সফরের অন্যতম দিক।
মোদী পেলেন উজবেকিস্তানের সর্বোচ্চ সম্মান
সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে উজবেকিস্তানের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘Oliy Darajali Do’stlik’ বা ‘Order of Highest Friendship’ প্রদান করা হয়। ভারত-উজবেকিস্তান বন্ধুত্ব এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মান দেওয়া হয়েছে। মোদী এই সম্মান ভারতের ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষ এবং দুই দেশের দীর্ঘ ঐতিহাসিক বন্ধুত্বকে উৎসর্গ করেছেন। এই সম্মানকে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের উষ্ণতার একটি প্রতীক হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বৃহত্তর মধ্য এশিয়া সফরের অংশ
মোদীর উজবেকিস্তান সফরকে আলাদা করে দেখলে এর পূর্ণ কৌশলগত গুরুত্ব বোঝা কঠিন। ২৯ আগস্ট থেকে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাঁর মধ্য এশিয়া সফরের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পর্ব কিরগিজস্তান। সেখানে তিনি সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা বা SCO-এর শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেবেন।
ফলে তাশখন্দ সফরের পর SCO মঞ্চে অংশগ্রহণ ভারতের মধ্য এশিয়া কূটনীতিকে আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি করছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, বাণিজ্য, সংযোগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার মতো বিষয় সেখানে আলোচনায় আসতে পারে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সফর?
সব মিলিয়ে মোদীর উজবেকিস্তান সফরের গুরুত্ব তিনটি বড় জায়গায়। প্রথমত, ভারত মধ্য এশিয়ায় নিজের কৌশলগত উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পেয়েছে। দ্বিতীয়ত, ইউরেনিয়াম ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের মতো কৌশলগত সম্পদের ক্ষেত্রে সহযোগিতার নতুন দরজা খুলেছে। তৃতীয়ত, ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ কোটি ডলারের বাণিজ্য এবং UPI-এর মতো ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রসার দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন গতি দিতে পারে।
তবে ঘোষিত লক্ষ্যগুলিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে হলে পরিবহণ, অর্থপ্রদান, বাজারে প্রবেশ এবং ব্যবসায়িক সহযোগিতার বাস্তব বাধাগুলি কমাতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি দ্রুত কার্যকর করা প্রয়োজন।
তবু নিঃসন্দেহে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রীর এই তাশখন্দ সফর ভারত-উজবেকিস্তান সম্পর্ককে একটি নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করেছে। কূটনীতি থেকে বাণিজ্য, ইউরেনিয়াম থেকে ডিজিটাল পেমেন্ট, শিক্ষা থেকে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ — বহু ক্ষেত্রকে একসঙ্গে সামনে রেখে দুই দেশ আগামী দিনের সম্পর্কের একটি বিস্তৃত রূপরেখা তৈরি করেছে।

