ভেনেজুয়েলা আধুনিক যুগে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে তার সব সক্রিয় হিমবাহ হারিয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে দেশটির শেষ হিমবাহ হামবোল্ট এতটাই সংকুচিত হয়েছে যে এটি আর হিমবাহ হিসেবে বিবেচিত নয়। বিজ্ঞানীরা এটিকে জলবায়ু পরিবর্তনের গুরুতর সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন। হিমবাহ বিলুপ্তির ফলে পানিসম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রকৃতির পরিবর্তন অনেক সময় ধীরে ধীরে ঘটে, আবার কখনও এমন একটি ঘটনা বিশ্ববাসীকে নাড়া দিয়ে যায়। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার শেষ সক্রিয় হিমবাহের বিলুপ্তি তেমনই একটি ঘটনা। একসময় ছয়টি হিমবাহে আচ্ছাদিত ছিল দেশটির আন্দিজ পর্বতমালা। কিন্তু কয়েক দশকের ব্যবধানে একে একে সবগুলো গলে গেছে। সর্বশেষ হামবোল্ট হিমবাহও এতটাই ছোট হয়ে পড়েছে যে বিজ্ঞানীরা আর তাকে “সক্রিয় হিমবাহ” হিসেবে বিবেচনা করছেন না। এর মাধ্যমে ভেনেজুয়েলা আধুনিক যুগে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে কার্যত সব হিমবাহ হারানোর তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি শুধু একটি দেশের ভৌগোলিক পরিবর্তনের ঘটনা নয়; বরং বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের একটি বাস্তব ও উদ্বেগজনক প্রতিচ্ছবি।
হিমবাহ কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
হিমবাহ হল বহু বছর ধরে জমে থাকা তুষার ও বরফের বিশাল স্তূপ, যা নিজের ওজনের কারণে ধীরে ধীরে নিচের দিকে সরে যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন পর্বতমালায় থাকা এসব হিমবাহকে প্রাকৃতিক জলের ভাণ্ডার বলা হয়। শুষ্ক মৌসুমে এগুলো ধীরে ধীরে গলে নদী, ঝর্ণা ও জলাধারে জল সরবরাহ করে।
এ কারণে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের পানীয় জল, কৃষি, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পাহাড়ি বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে হিমবাহের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। পাশাপাশি হাজার হাজার বছরের জলবায়ুর ইতিহাসও বরফের স্তরে সংরক্ষিত থাকে, যা বিজ্ঞানীদের গবেষণার জন্য অত্যন্ত মূল্যবান।
কীভাবে হারিয়ে গেল ভেনেজুয়েলার শেষ হিমবাহ?
বিশ শতকের শুরুতে ভেনেজুয়েলায় ছয়টি বড় হিমবাহ ছিল। এগুলো আন্দিজ পর্বতমালার সর্বোচ্চ অংশে অবস্থিত ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করলে বরফ গলার হারও বেড়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত শুধু হামবোল্ট হিমবাহ টিকে ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেটিও দ্রুত সংকুচিত হতে থাকে। এর আয়তন এতটাই কমে যায় যে এটি আর নিজস্ব গতিতে প্রবাহিত হতে পারে না। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এমন বরফস্তূপকে আর সক্রিয় হিমবাহ বলা যায় না।
অর্থাৎ বরফ পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায়নি, কিন্তু সেটি আর হিমবাহ হিসেবে কাজ করছে না। এ কারণেই বিজ্ঞানীরা ঘোষণা করেন যে ভেনেজুয়েলা কার্যত তার শেষ হিমবাহও হারিয়েছে।
কেন এত দ্রুত গলছে বরফ?
জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, এর মূল কারণ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে কয়লা, তেল ও গ্যাসের ব্যাপক ব্যবহার বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেনসহ বিভিন্ন গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বাড়িয়েছে। এসব গ্যাস সূর্যের তাপকে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে আটকে রাখে, ফলে গড় তাপমাত্রা ক্রমেই বৃদ্ধি পায়।
উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো তুলনামূলকভাবে ছোট হওয়ায় তাপমাত্রার সামান্য বৃদ্ধিতেও এগুলো দ্রুত গলে যায়। ভেনেজুয়েলার হিমবাহও সেই বাস্তবতার শিকার হয়েছে।
এর পাশাপাশি এল নিনোর মতো প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনাও সাময়িকভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে, যা বরফ গলার প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করে।
পরিবেশের ওপর কী প্রভাব পড়বে?
হিমবাহ হারানোর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে জলের ওপর। বরফ গলে ধীরে ধীরে যে জল নদী ও ঝর্নায় পৌঁছাত, তা কমে গেলে শুষ্ক মৌসুমে জলের সংকট দেখা দিতে পারে।
পাহাড়ি অঞ্চলের বহু উদ্ভিদ ও প্রাণী বরফনির্ভর পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে বেঁচে থাকে। হিমবাহ বিলীন হলে তাদের আবাসস্থল পরিবর্তিত হয়। অনেক প্রজাতি অন্যত্র সরে যেতে বাধ্য হয়, আবার কিছু প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতি হল বৈজ্ঞানিক গবেষণার। হাজার বছরের বরফস্তরে আটকে থাকা বায়ু, ধুলিকণা ও অন্যান্য উপাদান পৃথিবীর অতীত জলবায়ুর তথ্য বহন করে। হিমবাহ হারিয়ে গেলে সেই প্রাকৃতিক তথ্যভাণ্ডারও চিরতরে হারিয়ে যায়।
শুধু ভেনেজুয়েলাই নয়
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের হিমবাহও একই ধরনের সংকটের মুখে রয়েছে। হিমালয়, আল্পস, আন্দিজ, রকি পর্বতমালা এবং পূর্ব আফ্রিকার উচ্চভূমির বহু হিমবাহ গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে।
হিমালয়কে প্রায়ই “তৃতীয় মেরু” বলা হয়। কারণ এখানে বিপুল পরিমাণ বরফ সঞ্চিত রয়েছে। এই বরফ গলে এশিয়ার বহু প্রধান নদীর উৎপত্তি হয়েছে। যদি উষ্ণায়নের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকে, তবে আগামী শতাব্দীতে এসব হিমবাহের বড় অংশ হারিয়ে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়বে দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর।
জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি দৃশ্যমান প্রমাণ
একসময় জলবায়ু পরিবর্তনকে ভবিষ্যতের সমস্যা হিসেবে দেখা হতো। এখন সেটি আর ভবিষ্যতের নয়, বর্তমানের বাস্তবতা। বিশ্বের কোথাও দাবানল বেড়েছে, কোথাও দীর্ঘ খরা, কোথাও অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, চরম আবহাওয়ার ঘটনা ঘন ঘন ঘটছে। ভেনেজুয়েলার শেষ হিমবাহের বিলুপ্তিও সেই একই ধারাবাহিকতার অংশ।
কী করা জরুরি?
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এমন ঘটনা আরও বাড়বে। এজন্য জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বন উজাড় বন্ধ, কার্বন নিঃসরণ কমানো, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু চুক্তিগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজন পরিকল্পনা, জল ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষিত করার উদ্যোগও জোরদার করতে হবে।
ভারতের জন্য কী শিক্ষা?
ভেনেজুয়েলায় হিমবাহ না থাকলেও এর ঘটনা ভারতের জন্যেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কোনও দেশের সীমানা মানে না। হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গললে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত নদীর প্রবাহে দীর্ঘমেয়াদে পরিবর্তন আসতে পারে। অন্যদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও নদী ভাঙনের মতো সমস্যাও আরও তীব্র হতে পারে।
তাই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমাতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগের পাশাপাশি নিজেদের পরিবেশ সংরক্ষণেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
ভেনেজুয়েলার শেষ হিমবাহের বিলুপ্তি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের এক স্পষ্ট প্রতীক। প্রকৃতির এই নীরব পরিবর্তন ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা বহন করছে। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি যদি বর্তমান গতিতে চলতে থাকে, তবে আরও অনেক দেশ একই বাস্তবতার মুখোমুখি হবে।
আজ ভেনেজুয়েলা তার শেষ হিমবাহ হারিয়েছে। আগামী দিনে এই তালিকায় আর কোনও দেশের নাম যুক্ত হবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করছে বিশ্ব সম্প্রদায়ের বর্তমান সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের ওপর।

