বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ কি ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনে শেষ হতে চলেছে!

- Advertisement -

নেতানিয়াহুর উগ্র-ডানপন্থী ও কট্টর ধর্মীয় জোটকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ইসরায়েলের বিরোধী দলগুলো ব্যাপক প্রস্তুতি ও নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। গাদি আইজেনকোটের ‘ইয়াশার!’ (Yashar!) পার্টি : ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সের (IDF) প্রাক্তন প্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বে গঠিত নতুন দল ‘ইয়াশার!’ বর্তমানে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ কি ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনে শেষ হতে চলেছে!

২৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনটি দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হতে চলেছে। ইরান ও হিজবুল্লাহর সাথে বিধ্বংসী সংঘাত, ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতা এবং আমেরিকার মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রেক্ষাপটে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন গভীর সংকটে। সাম্প্রতিক সমস্ত জনমত জরিপ এবং রাজনৈতিক সমীকরণ অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির জনপ্রিয়তা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং আগামী নির্বাচনে তার জয়লাভের সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।

১. নেতানিয়াহুর বর্তমান জনপ্রিয়তা

ক্রমবর্ধমান পতন : ইরানের সাথে যুদ্ধ এবং পরবর্তীতে যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত ইসরায়েলের আমজনতা খুব একটা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেনি। হিব্রু ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ৯২.১% ইসরায়েলি মনে করেন এই যুদ্ধে ইরান জয়ী হয়েছে এবং ৮২.৯% মানুষের বিশ্বাস এই সংঘাত ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তাকে দুর্বল করেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৫৬.৪% মানুষ যুদ্ধ পরিচালনায় নেতানিয়াহুকে “ব্যর্থ” বা “দুর্বল” বলে আখ্যা দিয়েছেন।

সরাসরি প্রত্যাখ্যান : ২৫ জুলাই ২০২৬-এর সর্বশেষ ‘চ্যানেল ১২’-এর সমীক্ষা দেখাচ্ছে যে, মাত্র ৩৩% ইসরায়েলি নেতানিয়াহুকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান, যেখানে ৫৯% মানুষ অন্য কাউকে এই পদে বসানোর পক্ষে। হিজবুল্লাহর আক্রমণ ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়া এবং উত্তর ইসরায়েলের বাসিন্দাদের ক্ষোভের কারণে ঐতিহ্যগতভাবে লিকুদ পার্টির শক্ত ঘাঁটিগুলোতেও নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা ধসে পড়েছে।

২. বিরোধী দলগুলোর রণকৌশল ও জোট গঠন

নেতানিয়াহুর উগ্র-ডানপন্থী ও কট্টর ধর্মীয় জোটকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ইসরায়েলের বিরোধী দলগুলো ব্যাপক প্রস্তুতি ও নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।

গাদি আইজেনকোটের ‘ইয়াশার’ (Yashar) পার্টি : ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সের (IDF) প্রাক্তন প্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বে গঠিত নতুন দল ‘ইয়াশার’ বর্তমানে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণায় আইজেনকোট ৭ অক্টোবরের গোয়েন্দা ব্যর্থতার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি তুলেছেন।

‘টুগেদার’ (Together) জোট : সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট এবং বিরোধী দলীয় নেতা ইয়ার লাপিদের দল একত্রিত হয়ে ‘টুগেদার’ জোট গঠন করেছে। বিরোধী দলগুলোর প্রধান পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে — বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার, কট্টর অর্থোডক্স (Haredi) ইহুদিদের জন্য সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ আইন কার্যকর করা, এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমেরিকার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা।

৩. নির্বাচনী সমীক্ষা ও ক্ষমতার ব্লক বিভাজন

ইসরায়েলি রাজনীতিতে একক কোনও দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় না, ফলে সরকার গঠন নির্ভর করে ব্লকের (Coalition) ওপর। বর্তমান জরিপ অনুযায়ী ক্ষমতার ভারসাম্য নেতানিয়াহু-বিরোধী ব্লকের দিকে ঝুঁকে রয়েছে।

রাজনৈতিক ব্লক : সম্ভাব্য আসন সংখ্যা (১২০ আসনের নেসেটে) বর্তমান পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহু-বিরোধী ব্লক (Yashar, Together, Democrats ইত্যাদি) ৬১-৬২টি আসন জয় করে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা (৬১ আসন) অর্জনের পথে এগিয়ে থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।

নেতানিয়াহু-পন্থী ব্লক (Likud, Shas, UTJ) : ৩৬-৪৮টি আসন পেতে পারে। নেতানিয়াহুর নিজস্ব দল ‘লিকুদ’ মাত্র ২১-২২টি আসনে নেমে এসেছে, যা গত নির্বাচনের চেয়ে অনেক কম। অনিশ্চিত/আরব দলসমূহ ১০-১২টি আসন পেতে পারে। এবং কিং-মেকারের ভূমিকা পালন করতে পারে।

৪. আসন্ন নির্বাচনে কি ধরনের ফলাফল দেখা যেতে পারে?

২০২৬ সালের ২৭ অক্টোবরের এই নির্বাচনকে মূলত নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের ওপর একটি গণভোট হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দুটি সম্ভাব্য ফলাফলের পূর্বাভাস দেওয়া যায় –

সম্ভাবনা ১ (সবচেয়ে জোরালো) : নেতানিয়াহু যুগের অবসান ও নতুন জোট সরকার। গাদি আইজেনকোট বা নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বে একটি নেতানিয়াহু-বিরোধী ধর্মনিরপেক্ষ ও মধ্যপন্থী জাতীয় সরকার গঠিত হতে পারে। যেখানে আইজেনকোট প্রধানমন্ত্রী পদের অন্যতম শীর্ষ দাবিদার।

সম্ভাবনা ২ : রাজনৈতিক অচলাবস্থা (Deadlock)। ইসরায়েলের রাজনৈতিক ইতিহাস ভাঙাগড়ার ইতিহাস। যদি কোনও ব্লকই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায়, তবে দেশটিতে আবারও নতুন করে নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হলে নেতানিয়াহু অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থেকে যাওয়ার চেষ্টা করবেন।

সামগ্রিকভাবে বলা যায়, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি সাধারণত ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানদের জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দেয়, কিন্তু নেতানিয়াহুর ক্ষেত্রে তা উল্টো রূপ নিয়েছে। ইরানের সাথে যুদ্ধের অসমাপ্ত ও নেতিবাচক পরিণতি এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের কারণে ইসরায়েলের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। যদি কোনও বড় ধরনের অলৌকিক রাজনৈতিক ঘটনা না ঘটে তাহলে আসন্ন নির্বাচনে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর পরাজয় এবং ইসরায়েলের রাজনীতিতে এক নতুন নেতৃত্বের উত্থান ঘটার সম্ভাবনাই প্রবল।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -