সংঘাতে তেলের বাজারে অস্থিরতা, বিশ্ব অর্থনীতিতে ফের বাড়ছে চাপ

- Advertisement -

তেলের বাজারে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত ও হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে ব্যাঘাতের কারণে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী। দীর্ঘদিন দাম বেশি থাকলে পরিবহন, উৎপাদন ও পণ্যের খরচ বাড়তে পারে। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি, সুদের হার ও বিনিয়োগে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভারতসহ তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোর আমদানি ব্যয়ও বাড়তে পারে।

সংঘাতে তেলের বাজারে অস্থিরতা, বিশ্ব অর্থনীতিতে ফের বাড়ছে চাপ

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় ফের অস্থির হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজার। গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বড় ধরনের ব্যাঘাত তৈরি হওয়ায় বিশ্ববাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এরই মধ্যে শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৩.৮৬ ডলারে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের West Texas Intermediate বা WTI-এর দামও উঠেছে প্রায় ৮৬.৯৯ ডলারে। দুই বেঞ্চমার্কই টানা দ্বিতীয় সপ্তাহে মূল্যবৃদ্ধির পথে রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু তেলের দাম কতটা বাড়বে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং সরবরাহ-সংকট কতদিন স্থায়ী হবে, সেটিই বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

হরমুজ প্রণালী কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরের মধ্যে সংযোগকারী হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। যুদ্ধের আগে এই পথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যাতায়াত করত। সংঘাত ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে এই পথে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর কাছ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

এই পরিস্থিতির প্রভাব ইতিমধ্যেই তেলের দামে দেখা যাচ্ছে। ২০ আগস্ট ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক লাফে ২ শতাংশের বেশি বেড়ে ৯৩.৭৮ ডলারে উঠেছিল, যা প্রায় এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তর। WTI-ও ৮৭.৮৩ ডলারে পৌঁছায়।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার হুমকিতে নতুন উদ্বেগ

তেলের বাজারে চাপ আরও বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক চাপের ঘোষণা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া দেশগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ ইরানের তেল রপ্তানি আরও সংকুচিত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।

এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ফলে কূটনৈতিক সমাধানের বদলে সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?

তেলের দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি শুধু পেট্রোল বা ডিজেলের বাজারে সীমাবদ্ধ থাকে না। তেল পরিবহন, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি এবং বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে দীর্ঘসময় ধরে অপরিশোধিত তেলের দাম বেশি থাকলে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে।

এর প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচেও পড়তে পারে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে, আর পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্য ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের দামও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। অর্থনীতিতে এভাবে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে।

বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তেলের দাম দীর্ঘসময় বেশি থাকলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার কমানোর পরিকল্পনা পিছিয়ে যেতে পারে। এর ফলে ঋণের খরচ বেশি থাকতে পারে এবং বিনিয়োগ ও ভোক্তা ব্যয়ের ওপর চাপ পড়তে পারে।

বন্ড ও শেয়ারবাজারেও অস্থিরতা

তেলের বাজারের অস্থিরতার সঙ্গে বিশ্ব আর্থিক বাজারেও উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ বছরের Treasury yield ৫.৩৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ। একই সময়ে উচ্চ অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির দাম মূল্যস্ফীতির আশঙ্কাকে আরও জোরালো করছে।

বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হল অনিশ্চয়তা। সংঘাত দ্রুত কমে গেলে তেলের দাম নেমে আসতে পারে। কিন্তু হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল দীর্ঘদিন ব্যাহত হলে সরবরাহ-সংকট আরও গভীর হতে পারে। Reuters-এর বিশ্লেষণেও দেখা যাচ্ছে, বাজার এখন হরমুজ-সংকট দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকিকে আগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিয়ে মূল্য নির্ধারণ করছে।

ভারতের ওপরও পড়তে পারে প্রভাব

বিশ্বের অন্যতম বড় তেল আমদানিকারক দেশ ভারত। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দীর্ঘসময় উঁচু থাকলে ভারতের আমদানি ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। এর প্রভাব পড়তে পারে বাণিজ্য ঘাটতি, মুদ্রার বিনিময় হার এবং অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির ওপর।

তবে আন্তর্জাতিক তেলের দাম বাড়লেই ভারতে একই অনুপাতে জ্বালানির দাম বাড়বে — এমনটা নিশ্চিত নয়। সরকারের করনীতি, তেল বিপণন সংস্থাগুলোর মূল্য নির্ধারণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি — সবকিছুর ওপর চূড়ান্ত প্রভাব নির্ভর করবে।

সামনে কী হতে পারে?

এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক তেলবাজারের সবচেয়ে বড় নির্ধারক হলো যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাতের ভবিষ্যৎ এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল কবে স্বাভাবিক হয়। কূটনৈতিক সমাধান হলে সরবরাহের আশঙ্কা দ্রুত কমতে পারে এবং তেলের দামও নেমে আসার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়ে হরমুজে বাধা অব্যাহত থাকলে তেলের বাজারে আরও বড় অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি শুধু একদিনে তেলের দাম বেড়ে যাওয়া নয়। দীর্ঘসময় ধরে উচ্চ তেলের দাম বজায় থাকাই বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এতে মূল্যস্ফীতি, সুদের হার, বিনিয়োগ ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর একসঙ্গে চাপ তৈরি হতে পারে।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -