জাপানের কিউশু অঞ্চলে রিক্টার স্কেলে ৭.১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়েছে। কুমামোতো প্রিফেকচারকে কেন্দ্র করে অনুভূত কম্পনে ভবন, সড়ক ও অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে। উদ্ধারকারী দল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় তৎপরতা চালাচ্ছে। সরকার জরুরি সহায়তা কার্যক্রম শুরু করেছে এবং সম্ভাব্য আফটারশকের কারণে নাগরিকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কিউশু (Kyushu) দ্বীপে শক্তিশালী একটি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। জাপানের আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল রিক্টার স্কেলে ৭.১। এর কেন্দ্রস্থল ছিল কুমামোতো (Kumamoto) প্রিফেকচারের দক্ষিণাংশের নিকটবর্তী এলাকা। ভূমিকম্পের কম্পন কাগোশিমা, মিয়াজাকি এবং আশপাশের আরও কয়েকটি অঞ্চলে স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়। কম্পনের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকেই দ্রুত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন।
ভূমিকম্পের কেন্দ্র কোথায়?
প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে জানা গেছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তি হয়েছে ভূ-পৃষ্ঠের কয়েক কিলোমিটার নিচে। কেন্দ্রস্থল কুমামোতো অঞ্চলের কাছাকাছি হওয়ায় সেখানে কম্পনের তীব্রতা তুলনামূলক বেশি ছিল। জাপানের বিভিন্ন ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র দ্রুত পরিস্থিতি বিশ্লেষণ শুরু করে এবং সম্ভাব্য আফটারশকের বিষয়ে জনগণকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেয়।
কেন ঘটল এই ভূমিকম্প?
জাপান পৃথিবীর অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। এর প্রধান কারণ দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। এই অঞ্চলে পৃথিবীর কয়েকটি প্রধান টেকটোনিক প্লেট পরস্পরের সংযোগস্থলে অবস্থান করছে। প্লেটগুলোর ক্রমাগত চাপ, সংঘর্ষ এবং একটির নিচে আরেকটির সরে যাওয়ার ফলে ভূগর্ভে বিপুল শক্তি জমা হয়। সেই শক্তি হঠাৎ মুক্তি পেলেই ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপানের নিচে প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্লেট ও ফিলিপাইন সাগরীয় প্লেটের গতিশীলতার কারণে নিয়মিত ছোট-বড় ভূমিকম্প ঘটে। উন্নত প্রযুক্তি ও প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।
কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে?
ভূমিকম্পের পর বিভিন্ন এলাকায় ভবনে ফাটল, সড়কের ক্ষতি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্নের খবর পাওয়া গেছে। কিছু স্থানে ভূমিধসের ঘটনাও ঘটেছে। কয়েকটি এলাকায় গ্যাস লাইনের ক্ষতি হওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসনের প্রাথমিক প্রতিবেদনে জানা গেছে, একটি বাণিজ্যিক ভবনে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং কয়েকটি শিল্পকারখানায় উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এছাড়া কিছু সেতু ও সড়ক পরিদর্শনের জন্য যান চলাচলে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে।
পরিবহন ব্যবস্থায় প্রভাব
নিরাপত্তাজনিত কারণে কয়েকটি বুলেট ট্রেনের (শিনকানসেন) চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। কিছু আঞ্চলিক ট্রেনও বন্ধ রাখা হয় প্রকৌশলগত পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত। বিমানবন্দরগুলোতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর না থাকলেও কয়েকটি ফ্লাইটের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
সড়কপথে যান চলাচলও কিছু সময়ের জন্য ব্যাহত হয়। জরুরি উদ্ধার যানবাহন যাতে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছাতে পারে, সে জন্য অনেক সড়কে বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থা চালু করা হয়।
প্রাণহানি ও আহতের খবর
সরকারি উদ্ধার সংস্থাগুলো জানিয়েছে, ভূমিকম্পে প্রাণহানি ও আহতের ঘটনা ঘটেছে। কয়েকজন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছিলেন, যাদের উদ্ধারে দমকল, পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবীরা একযোগে কাজ করছেন। আহতদের নিকটবর্তী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং গুরুতর আহতদের বিশেষ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
উদ্ধার অভিযান চলমান থাকায় হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
সরকারের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ
ভূমিকম্পের পরপরই জাপান সরকার জরুরি বৈঠক আহ্বান করে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসক, অগ্নিনির্বাপক বাহিনী এবং সেলফ-ডিফেন্স ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে। অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র চালু করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ, গ্যাস ও যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে।
আফটারশকের আশঙ্কা
ভূমিকম্পের পর সাধারণত ছোট বা মাঝারি মাত্রার একাধিক আফটারশক অনুভূত হতে পারে। জাপানের আবহাওয়া সংস্থা নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে প্রবেশ না করার পরামর্শ দিয়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি থাকায় সেখানে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর অবস্থা
জাপানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আশপাশের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা পরীক্ষা চালানো হয়েছে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে কোনো তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়া বা বড় ধরনের প্রযুক্তিগত ত্রুটির তথ্য পাওয়া যায়নি। তবুও পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশ্বের অন্যতম প্রস্তুত দেশ জাপান আবারও একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের মুখোমুখি হলো। উন্নত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, শক্তিশালী অবকাঠামো এবং দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রমের কারণে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। তবুও আফটারশকের আশঙ্কা পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসন জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। উদ্ধার অভিযান এবং ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন শেষ হলে হতাহত ও আর্থিক ক্ষতির আরও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে।

