চীন পৃথিবীমুখী বিপজ্জনক গ্রহাণু প্রতিহত করতে দুই-ধাপের নতুন প্রযুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে। এতে প্রথমে কাইনেটিক ইমপ্যাক্টরের মাধ্যমে গ্রহাণুকে আঘাত করে পরে অভ্যন্তরে পারমাণবিক বিস্ফোরণের ধারণা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে নাসা DART মিশনের সফলতার ভিত্তিতে কাইনেটিক ইমপ্যাক্টর প্রযুক্তিকেই বর্তমানে সবচেয়ে কার্যকর ও পরীক্ষিত পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করছে। উভয় পক্ষই আগাম শনাক্তকরণকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে।

মহাকাশে ঘুরে বেড়ানো কোটি কোটি গ্রহাণুর মধ্যে অধিকাংশই পৃথিবীর জন্য কোনও হুমকি নয়। তবে কিছু নিকট-পৃথিবী গ্রহাণু (Near-Earth Asteroids) ভবিষ্যতে সংঘর্ষের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। এমন ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন মহাকাশ সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। সেই গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে চীনের প্রস্তাবিত একটি দুই-ধাপের গ্রহাণু প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি। গবেষকদের দাবি, এই পদ্ধতি ভবিষ্যতে বড় আকারের বিপজ্জনক গ্রহাণুর গতিপথ পরিবর্তন কিংবা প্রয়োজনে তা ধ্বংস করার ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে।
চীনের এই গবেষণা আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও প্রযুক্তিটি এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে, তবুও এটি ভবিষ্যতের গ্রহাণু প্রতিরক্ষা কৌশল নিয়ে নতুন চিন্তার সুযোগ তৈরি করেছে।
কী এই দুই-ধাপের প্রযুক্তি?
চীনা গবেষকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে একটি বিশেষ মহাকাশযান অত্যন্ত উচ্চগতিতে গ্রহাণুর সঙ্গে সংঘর্ষ করবে। এই পদ্ধতিকে বলা হয় কাইনেটিক ইমপ্যাক্টর। সংঘর্ষের ফলে গ্রহাণুর পৃষ্ঠে একটি গভীর গর্ত সৃষ্টি হবে।
এরপর দ্বিতীয় ধাপে সেই গর্তের ভেতরে একটি পারমাণবিক বিস্ফোরক প্রবেশ করিয়ে বিস্ফোরণ ঘটানোর ধারণা দেওয়া হয়েছে। গবেষকদের মতে, গ্রহাণুর অভ্যন্তরে বিস্ফোরণ ঘটলে শক্তির অপচয় কম হয় এবং বিস্ফোরণের প্রভাব সরাসরি ভেতরে কাজ করে। ফলে গ্রহাণুটি ভেঙে যেতে পারে অথবা তার কক্ষপথ উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হতে পারে।
কেন ভেতরে বিস্ফোরণের কথা বলা হচ্ছে?
বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যদি কোনও বিস্ফোরণ কেবল গ্রহাণুর বাইরের অংশে ঘটে, তবে তার বড় অংশের শক্তি মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু অভ্যন্তরে বিস্ফোরণ ঘটলে অধিকাংশ শক্তি গ্রহাণুর গঠনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
এই কারণে একই পরিমাণ শক্তি ব্যবহার করেও তুলনামূলক বেশি ফল পাওয়া সম্ভব হতে পারে। তবে এটি এখন পর্যন্ত কম্পিউটারভিত্তিক বিশ্লেষণ ও গবেষণার ফল; বাস্তব মহাকাশ মিশনে এমন প্রযুক্তি এখনও ব্যবহার করা হয়নি।
নাসার অভিজ্ঞতা কী বলছে?
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ইতোমধ্যেই গ্রহাণুর গতিপথ পরিবর্তনের একটি বাস্তব পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করেছে।
২০২২ সালে পরিচালিত ডাবল অ্যাস্টেরয়েড রিডাইরেকশন টেস্ট (DART) মিশনে একটি মহাকাশযানকে ডাইমরফোস নামের একটি ছোট গ্রহাণুর সঙ্গে সংঘর্ষ করানো হয়। সংঘর্ষের পর বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন যে গ্রহাণুটির কক্ষপথ পরিবর্তিত হয়েছে। এটি ছিল মানব ইতিহাসে প্রথম সফল গ্রহাণু-বিচ্যুতি পরীক্ষা।
নাসার মতে, বর্তমানে কাইনেটিক ইমপ্যাক্টর প্রযুক্তিই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত এবং পরীক্ষিত প্রতিরক্ষা পদ্ধতি।
আগাম সতর্কতাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রহাণু প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সময় মতো বিপজ্জনক বস্তু শনাক্ত করা।
যদি কোনও গ্রহাণুকে পৃথিবীতে পৌঁছানোর বহু বছর আগে শনাক্ত করা যায়, তাহলে অল্প শক্তি ব্যবহার করেই তার গতিপথ পরিবর্তন করা সম্ভব। কিন্তু খুব অল্প সময় হাতে থাকলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেক বেশি জটিল হয়ে পড়ে।
এই কারণেই বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ শক্তিশালী টেলিস্কোপ, কৃত্রিম উপগ্রহ এবং আধুনিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলছে।
পারমাণবিক প্রযুক্তি নিয়ে সতর্ক অবস্থান
চীনের নতুন প্রস্তাবে পারমাণবিক বিস্ফোরণের বিষয়টি থাকলেও নাসা এ ধরনের প্রযুক্তিকে নিয়মিত সমাধান হিসেবে বিবেচনা করে না।
নাসার মতে, যদি কখনও অত্যন্ত বড় কোনও গ্রহাণু পৃথিবীর দিকে দ্রুত এগিয়ে আসে এবং অন্য কোনও কার্যকর উপায় অবশিষ্ট না থাকে, তখন পারমাণবিক প্রযুক্তি শেষ বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন, নিরাপত্তা, মহাকাশ চুক্তি এবং পরিবেশগত ঝুঁকির মতো একাধিক বিষয় জড়িত।
চীনের পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক
গ্রহাণু প্রতিরক্ষার পাশাপাশি চীন একটি উন্নত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও এগিয়ে নিচ্ছে।
এই ব্যবস্থায় মহাকাশভিত্তিক উপগ্রহ এবং ভূমিভিত্তিক বৃহৎ টেলিস্কোপ একসঙ্গে কাজ করবে। এর লক্ষ্য হবে পৃথিবীর জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ গ্রহাণুগুলোকে যত দ্রুত সম্ভব শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনে আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্ব
মহাকাশ থেকে আসা সম্ভাব্য বিপদ কোনও একটি দেশের সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাই বিজ্ঞানীরা মনে করেন, গ্রহাণু প্রতিরক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নাসা, ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ESA), চীনসহ বিভিন্ন দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে তথ্য বিনিময়, যৌথ গবেষণা এবং নতুন প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছে। ভবিষ্যতে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে আরও কার্যকর বৈশ্বিক গ্রহাণু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হতে পারে।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
চীনের নতুন প্রযুক্তি এখনও গবেষণাগারের ধারণা থেকে বাস্তব প্রয়োগের পথে অনেক দূরে। সফলভাবে ব্যবহার করতে হলে মহাকাশযান পরিচালনা, বিস্ফোরণ নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক অনুমোদন এবং প্রযুক্তিগত নিরাপত্তাসহ বহু বিষয়ের সমাধান প্রয়োজন হবে।
অন্যদিকে নাসার DART মিশন ইতোমধ্যেই দেখিয়ে দিয়েছে যে সঠিক সময়ে পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে গ্রহাণুর গতিপথ পরিবর্তন করা সম্ভব।
বিজ্ঞানীদের মতে, ভবিষ্যতে উন্নত পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং নতুন প্রতিরক্ষা কৌশলের সমন্বয়ই পৃথিবীকে সম্ভাব্য মহাজাগতিক বিপর্যয় থেকে আরও নিরাপদ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

