কমনওয়েলথ গেমস ২০২৬-এ ভারত ধারাবাহিক সাফল্যে পদক তালিকার দশম স্থানে রয়েছে। অ্যাথলেটিক্স, জুডো, ভারোত্তোলন, প্যারা অ্যাথলেটিক্স ও বক্সিংয়ে ভারতীয় ক্রীড়াবিদদের পারফরম্যান্স দেশের পদকসংখ্যা বাড়িয়েছে। সামনে একাধিক ফাইনাল বাকি থাকায় স্বর্ণপদক বাড়িয়ে র্যাঙ্কিং আরও উন্নত করার সম্ভাবনা রয়েছে। শেষ পর্যায়ে তাই ভারতের দিকে ক্রীড়াপ্রেমীদের প্রত্যাশা বেড়েছে।

স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ গেমস ২০২৬-এ ভারত ধীরে ধীরে নিজেদের শক্ত অবস্থান গড়ে তুলছে। প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এসে ভারত একাধিক খেলায় ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করেছে। বিশেষ করে অ্যাথলেটিক্স, জুডো, ভারোত্তোলন, প্যারা অ্যাথলেটিক্স ও বক্সিংয়ে ভারতীয় ক্রীড়াবিদদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেশের পদকভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছে এবং পদক তালিকায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এনে দিয়েছে।
সর্বশেষ উপলব্ধ সরকারি ও নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, নবম দিনের শেষে ভারতের ঝুলিতে রয়েছে ২৩টি পদক—এর মধ্যে ৩টি স্বর্ণ, ৯টি রৌপ্য এবং ১১টি ব্রোঞ্জ। এই সাফল্যের সুবাদে ভারত পদক তালিকার দশম স্থানে রয়েছে। তবে সামনে একাধিক ফাইনাল বাকি থাকায় এবং বিশেষ করে বক্সিংয়ে ভারতের শক্তিশালী উপস্থিতির কারণে র্যাঙ্কিং আরও উন্নত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ কমনওয়েলথ গেমসে দেশগুলোর অবস্থান নির্ধারণে মোট পদকের চেয়ে স্বর্ণপদকের সংখ্যাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাই কয়েকটি অতিরিক্ত স্বর্ণ ভারতের অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে দিতে পারে।
ভারতের সাম্প্রতিক সাফল্যের অন্যতম আকর্ষণ ছিল পুরুষদের জ্যাভলিন থ্রো। অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন নীরজ চোপড়া মৌসুমের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স করেও রৌপ্যপদক জিতেছেন। একই ইভেন্টে যশবীর সিং ব্যক্তিগত সেরা নিক্ষেপ করে ব্রোঞ্জ জয় করেন। ফলে জ্যাভলিনে ভারত একই সঙ্গে দুটি পদক অর্জন করে, যা এবারের গেমসে দেশের অন্যতম স্মরণীয় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অ্যাথলেটিক্সে আরও একটি ইতিহাস গড়েছেন তেজস্বিন শঙ্কর। দীর্ঘদিনের চোট কাটিয়ে পুরুষদের ডেকাথলনে ব্রোঞ্জ জিতে তিনি কমনওয়েলথ গেমসের ইতিহাসে এই ইভেন্টে পদকজয়ী প্রথম ভারতীয় অ্যাথলেট হন। তাঁর এই অর্জন ভারতীয় অ্যাথলেটিক্সের ক্রমবর্ধমান শক্তির পরিচয় বহন করে।
জুডোতেও ভারত নজরকাড়া পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছে। নারীদের ৪৮ কেজি বিভাগে অস্মিতা দে স্বর্ণ জিতে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। একই দিনে হর্ষ সিং পুরুষদের বিভাগে স্বর্ণ জিতে কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের প্রথম পুরুষ জুডো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এছাড়া ইয়ামিনি মৌর্য রৌপ্য জিতে ভারতের পদকসংখ্যা আরও বাড়িয়ে দেন। একদিনে জুডো থেকে একাধিক পদক ভারতের সামগ্রিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।
ভারোত্তোলনে ভারতের সাফল্যের ধারাও অব্যাহত রয়েছে। অলিম্পিক পদকজয়ী মীরাবাই চানু গেমসের শুরুতেই ভারতের প্রথম স্বর্ণ এনে দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেন। তাঁর এই সাফল্য শুধু পদক তালিকায় নয়, পুরো ভারতীয় দলের মনোবলেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। পরবর্তী সময়েও ভারোত্তোলনে ভারত একাধিক পদক জিতে নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
প্যারা অ্যাথলেটিক্সেও ভারত উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বিভিন্ন ইভেন্টে ভারতীয় প্যারা ক্রীড়াবিদরা পদক জিতে প্রমাণ করেছেন যে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের সক্ষমতা এখন আরও বিস্তৃত। মূল ও প্যারা—দুই বিভাগেই ধারাবাহিক সাফল্য ভারতের সামগ্রিক ক্রীড়া উন্নয়নের ইতিবাচক দিক তুলে ধরছে।
তবে ভারতের সবচেয়ে বড় আশা এখন বক্সিং। ভারতীয় বক্সাররা একের পর এক ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছেন। ফলে একাধিক রৌপ্যপদক ইতোমধ্যেই নিশ্চিত হয়েছে। ফাইনালে ভালো ফল করতে পারলে ভারতের স্বর্ণপদকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং সেটিই পদক তালিকায় ভারতের অবস্থান উন্নত করার প্রধান সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। শেষ দুই দিনের সূচিতে বক্সিংয়ের পাশাপাশি অ্যাথলেটিক্স ও আরও কয়েকটি পদক নির্ধারণী ইভেন্ট রয়েছে, যেখানে ভারতীয় ক্রীড়াবিদদের কাছ থেকে বড় প্রত্যাশা রয়েছে।
বর্তমানে পদক তালিকায় অস্ট্রেলিয়া শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। ইংল্যান্ড, কানাডা ও নিউজিল্যান্ডও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ভারত মোট পদকের হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছাকাছি থাকলেও স্বর্ণপদকের সংখ্যায় পিছিয়ে থাকায় দশম স্থানে রয়েছে। তবে প্রতিযোগিতা এখনও শেষ হয়নি এবং বাকি ইভেন্টগুলো ভারতের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে রেখেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো বিভিন্ন খেলায় সমানভাবে সাফল্য অর্জন। আগে যেখানে নির্দিষ্ট কয়েকটি ডিসিপ্লিনের ওপর ভারতের পদক নির্ভর করত, এবার অ্যাথলেটিক্স, জুডো, ভারোত্তোলন, প্যারা অ্যাথলেটিক্স ও বক্সিং—প্রায় সব ক্ষেত্রেই ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পারফরম্যান্স দেখাচ্ছে। এটি দেশের ক্রীড়া কাঠামোর উন্নয়নেরও একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।
গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসের সমাপনী অনুষ্ঠানের আগে ভারতের সামনে এখনও একাধিক পদক জয়ের সুযোগ রয়েছে। যদি সম্ভাবনাময় ইভেন্টগুলোতে ভারতীয় ক্রীড়াবিদরা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেন, তবে পদক তালিকায় ভারতের অবস্থান আরও কয়েক ধাপ ওপরে উঠে আসতে পারে। সেই লক্ষ্য নিয়েই এখন শেষ লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারতীয় দল। দেশের ক্রীড়াপ্রেমীদের নজরও তাই এখন গ্লাসগোর শেষ দুই দিনের প্রতিটি ইভেন্টের দিকে।

