ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে ইবোলার বিরল Bundibugyo virus দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় আফ্রিকায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হাজারও মানুষ আক্রান্ত এবং তিন হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। নতুন প্রদেশেও ভাইরাস শনাক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি ও কার্যকর ভ্যাকসিনের সীমাবদ্ধতা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোতেও বাড়ানো হয়েছে নজরদারি ও প্রস্তুতি।

আফ্রিকায় ইবোলা পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে (ডিআরসি) চলমান ইবোলা প্রাদুর্ভাব দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয়, সংক্রমণ এখন পূর্বাঞ্চলের সীমানা পেরিয়ে দেশের পশ্চিমাঞ্চলেও পৌঁছে গেছে। নতুন করে সাউদ-উবাঙ্গি (Sud-Ubangi) প্রদেশে ইবোলার বিরল Bundibugyo virus শনাক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর সর্বশেষ ১০ সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডিআরসিতে Bundibugyo virus-এ আক্রান্ত নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৭৫৭ জন। এদের মধ্যে ৩ হাজার ২৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ নিশ্চিত আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুহার প্রায় ৪৮ দশমিক ৩ শতাংশ। WHO জানিয়েছে, দেশের ছয়টি প্রদেশের ৬১টি স্বাস্থ্য অঞ্চলে তখন পর্যন্ত সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল।
তবে ১১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত নতুন প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা Associated Press (AP) জানিয়েছে, ভাইরাসটি এখন ডিআরসির সপ্তম প্রদেশ সাউদ-উবাঙ্গিতে পৌঁছেছে। সেখানে পরীক্ষায় Bundibugyo virus শনাক্ত হয়েছে। এর আগে সংক্রমণ মূলত দেশের পূর্বাঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। নতুন এই ভৌগোলিক বিস্তারকে পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। AP-এর প্রতিবেদনে ৬ হাজার ৯৪২টি আক্রান্ত এবং ৩ হাজার ৩৪৯টি মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কেন Bundibugyo virus নিয়ে এত উদ্বেগ?
বর্তমান প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী ভাইরাসটি ইবোলা পরিবারের হলেও এটি প্রচলিত Zaire ebolavirus নয়। এটি Bundibugyo প্রজাতির ভাইরাস। এই প্রজাতির বিরুদ্ধে বর্তমানে অনুমোদিত নির্দিষ্ট ভ্যাকসিন বা চিকিৎসা নেই। ফলে রোগী শনাক্তকরণ, দ্রুত চিকিৎসা, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা মানুষদের নজরদারি এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র।
WHO জানিয়েছে, Bundibugyo virus-এর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ভ্যাকসিন ও চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরির কাজ চলছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালও পরিচালিত হচ্ছে।
কোথায় সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ?
ডিআরসির Ituri প্রদেশ এখনও সংক্রমণের প্রধান কেন্দ্র। WHO-এর হিসাবে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শুধু এই প্রদেশেই ৫ হাজার ৪০৬টি নিশ্চিত সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে North Kivu এবং Haut-Uélé-তেও সংক্রমণ অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষ করে North Kivu-তে নতুন সংক্রমণ বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ উদ্বিগ্ন। WHO বলছে, নতুন নতুন স্বাস্থ্য অঞ্চলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি আক্রান্ত এলাকাগুলোর মধ্যে মানুষের চলাচল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতি বড় বাধা
কঙ্গোর পরিস্থিতি শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সংকট। দেশের পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় সংঘাতের কারণে বহু মানুষ নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
বাস্তুচ্যুত মানুষের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পর্যাপ্ত পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবার অভাব রয়েছে। ফলে সংক্রমিত ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করা, তাকে আলাদা রাখা এবং তার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের অনুসরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
WHO জানিয়েছে, Ituri-তে নিরাপত্তাহীনতা ও বাস্তুচ্যুতি স্বাস্থ্যসেবা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে বাধা দিচ্ছে। খনি এলাকা, অনানুষ্ঠানিক বসতি এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত ভিড় পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
সীমান্ত পেরিয়ে ছড়ানোর আশঙ্কা
কঙ্গোর প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। WHO-এর ঝুঁকি মূল্যায়নে ডিআরসির জন্য ঝুঁকি ‘অত্যন্ত বেশি’ এবং সীমান্তবর্তী দেশগুলোর জন্য ‘উচ্চ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আফ্রিকার অন্যান্য অঞ্চল ও বৈশ্বিক পর্যায়ে ঝুঁকি আপাতত কম বলে WHO জানিয়েছে।
ইতোমধ্যে Uganda-তে এই প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল। WHO-এর হিসাবে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত Uganda-তে ২০টি নিশ্চিত সংক্রমণ এবং দুটি মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ডিআরসি থেকে চিকিৎসার জন্য জার্মানিতে নেওয়া রোগীদের মধ্যেও Bundibugyo virus শনাক্ত হয়েছিল।
বর্তমানে বিমানবন্দর, বন্দর ও সরকারি সীমান্তপথে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও নজরদারি চালু রয়েছে। কিন্তু অনানুষ্ঠানিক সীমান্তপথ দিয়ে মানুষের চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব না হওয়ায় ভাইরাস অন্য দেশে পৌঁছে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
ভ্যাকসিন নিয়ে জটিলতা
ইবোলা মোকাবিলায় ব্যবহৃত Ervebo ভ্যাকসিন রয়েছে। কিন্তু এটি মূলত Zaire ebolavirus-এর বিরুদ্ধে তৈরি। Bundibugyo virus-এর বিরুদ্ধে এর কার্যকারিতা নিশ্চিত নয়। তাই বর্তমান প্রাদুর্ভাবে ভ্যাকসিন ব্যবহারের বিষয়টি বিশেষজ্ঞদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, Bundibugyo virus-এর জন্য নতুন ভ্যাকসিন ও চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা চলছে। কঙ্গোতেও সম্ভাব্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি ক্লিনিক্যাল গবেষণা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
WHO-এর সতর্কবার্তা
WHO ১৭ মে ২০২৬-এ ডিআরসি ও Uganda-র Bundibugyo virus প্রাদুর্ভাবকে Public Health Emergency of International Concern (PHEIC) হিসেবে ঘোষণা করেছিল। তবে সংস্থাটি এটিকে তখনও বৈশ্বিক মহামারি-পরিস্থিতি হিসেবে চিহ্নিত করেনি।
WHO বর্তমানে আক্রান্ত দেশগুলোর ওপর ভ্রমণ বা বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরামর্শ দেয়নি। বরং দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা, সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা মানুষদের নজরদারি, নিরাপদ দাফন এবং সীমান্তবর্তী দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
বিশেষজ্ঞদের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—ভাইরাসটির নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়া কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। কারণ আক্রান্ত অঞ্চল যত বাড়বে, তত বেশি স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসাকেন্দ্র, পরীক্ষাগার, সুরক্ষা সরঞ্জাম ও অর্থের প্রয়োজন হবে।
এর পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জনও গুরুত্বপূর্ণ। ইবোলা মোকাবিলায় আক্রান্তদের দ্রুত আলাদা করা এবং মৃতদের নিরাপদে দাফন করা প্রয়োজন হলেও এসব পদক্ষেপ অনেক সময় স্থানীয় সামাজিক ও ধর্মীয় রীতির সঙ্গে সংঘাত তৈরি করে। ফলে স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় সম্প্রদায় ও নেতাদের সম্পৃক্ত করাও জরুরি।
সব মিলিয়ে, কঙ্গোর বর্তমান ইবোলা পরিস্থিতি এখনও মূলত আঞ্চলিক স্বাস্থ্য সংকট হলেও এর দ্রুত ভৌগোলিক বিস্তার আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। নতুন প্রদেশে Bundibugyo virus শনাক্ত হওয়ায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আরও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। WHO ও আফ্রিকার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নজর এখন তাই কঙ্গোর পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সীমান্ত পরিস্থিতির ওপরও।

