আগস্টে কলম্বিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভানুয়াতুতে পরপর শক্তিশালী ভূমিকম্পে উদ্বেগ বেড়েছে। তবে বিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্বজুড়ে ভূমিকম্পের হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রমাণ নেই। টেকটোনিক প্লেটের চলাচল ও সক্রিয় ফল্টের কারণে এসব ভূমিকম্প হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া ও ভানুয়াতু ‘রিং অব ফায়ার’-এর সক্রিয় অঞ্চলে অবস্থিত। পরপর ভূমিকম্প মানেই আরও বড় ভূমিকম্প আসছে — এমন পূর্বাভাসও বৈজ্ঞানিকভাবে সম্ভব নয়।

মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে বিশ্বের একাধিক ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্প। প্রথমে কলম্বিয়া, এরপর ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস দ্বীপের কাছে ভয়াবহ কম্পন, তার পরেই ভানুয়াতুর কাছে ৬.১ মাত্রার ভূমিকম্প — ঘটনাগুলোর সময়ের ব্যবধান কম হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, পৃথিবীতে কি ভূমিকম্পের প্রবণতা হঠাৎ বেড়ে গেছে?
আগস্ট ২০২৬-এর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই প্রশ্নকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। কলম্বিয়ায় ১০ আগস্ট ৭.৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। কয়েক দিনের মধ্যেই ১৫ আগস্ট ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস দ্বীপের কাছে ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির খবর আসে। এর পর ১৬ আগস্ট ভানুয়াতুর উপকূলের কাছে ৬.১ মাত্রার কম্পন অনুভূত হয়।
ঘটনাগুলো নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। কিন্তু ভূকম্পবিদ্যার দৃষ্টিতে এর অর্থ এই নয় যে গোটা পৃথিবী হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে ভূমিকম্পপ্রবণ হয়ে উঠেছে।
পরপর ভূমিকম্প, কিন্তু কি একই কারণে?
কলম্বিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভানুয়াতু — তিনটি দেশই ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। তবে তিন জায়গায় হওয়া ভূমিকম্পকে একই ভূতাত্ত্বিক ঘটনার অংশ হিসেবে দেখার কারণ নেই।
ভূমিকম্পের প্রধান কারণ টেকটোনিক প্লেটের চলাচল। পৃথিবীর বাইরের শক্ত স্তরটি বেশ কয়েকটি বিশাল প্লেটে বিভক্ত। এই প্লেটগুলো অত্যন্ত ধীরে হলেও ক্রমাগত গতিশীল। কোথাও একটি প্লেট অন্যটির দিকে এগিয়ে যায়, কোথাও দূরে সরে যায়, আবার কোথাও পাশাপাশি ঘর্ষণের মাধ্যমে সরে যায়।
এই চলাচলের সময় ভূত্বকের বিভিন্ন অংশে চাপ তৈরি হয়। কোনও সক্রিয় ফল্টে দীর্ঘ সময় ধরে চাপ জমতে জমতে একসময় শিলাস্তরের বাধা ভেঙে গেলে হঠাৎ শক্তি মুক্ত হয়। সেই শক্তিই ভূকম্পন তরঙ্গ হিসেবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং সৃষ্টি হয় ভূমিকম্প।
অর্থাৎ ভূমিকম্পের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। বিশ্বের এক প্রান্তে ভূমিকম্প হওয়ার কয়েক দিন পর অন্য প্রান্তে ভূমিকম্প হলেই যে প্রথমটির কারণে দ্বিতীয়টি হয়েছে, তা নয়।
ইন্দোনেশিয়া ও ভানুয়াতু কেন এত সক্রিয়?
ইন্দোনেশিয়া এবং ভানুয়াতু উভয়ই পৃথিবীর অত্যন্ত সক্রিয় টেকটোনিক অঞ্চলে অবস্থিত। প্রশান্ত মহাসাগরকে ঘিরে যে বিশাল ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল রয়েছে, সেটিই পরিচিত ‘রিং অব ফায়ার’ নামে।
USGS-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভূমিকম্পগুলোর প্রায় ৮১ শতাংশ এই circum-Pacific seismic belt বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় ভূকম্পন বলয়ের আশপাশে ঘটে। এই অঞ্চলে একাধিক টেকটোনিক প্লেটের সীমানা রয়েছে এবং অনেক জায়গায় একটি প্লেট অন্য প্লেটের নিচে ঢুকে যায়।
ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান এই সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক বলয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশে। ফলে দেশটিতে নিয়মিত ভূমিকম্প এবং আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ দেখা যায়।
ভানুয়াতুও একই বিস্তৃত ভূকম্পনপ্রবণ অঞ্চলের অংশ। ১৬ আগস্টের ৬.১ মাত্রার ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল ভানুয়াতুর উপকূলের কাছে এবং ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল প্রায় ১৮৮ কিলোমিটার।
কলম্বিয়ার অবস্থানও কম ঝুঁকিপূর্ণ নয়
কলম্বিয়াতেও একাধিক টেকটোনিক প্লেটের পারস্পরিক ক্রিয়া ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। ১০ আগস্টের ৭.৪ মাত্রার ভূমিকম্পটি দেশটির সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে সামনে আসে। ভূমিকম্পটির ধরন ছিল strike-slip, অর্থাৎ ফল্টের দুই পাশের শিলাস্তর মূলত অনুভূমিকভাবে একে অপরের পাশ দিয়ে সরে যায়।
এ ধরনের ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা শুধু ভূমিকম্পের মাত্রার ওপর নির্ভর করে না। উপকেন্দ্রের গভীরতা, মাটির প্রকৃতি, ভবনের নির্মাণমান এবং জনবসতির ঘনত্বও বড় ভূমিকা রাখে।
তাই একটি মাঝারি মাত্রার অগভীর ভূমিকম্প কখনও কখনও একটি অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী কিন্তু গভীর ভূমিকম্পের চেয়েও বেশি ক্ষয়ক্ষতি করতে পারে।
তাহলে কি ২০২৬ সালে ভূমিকম্প সত্যিই বেড়েছে?
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি দিয়েছে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা USGS। সংস্থাটির মতে, ভূমিকম্পের সংখ্যা কোনো নির্দিষ্ট সময়ে কিছুটা বাড়া বা কমা স্বাভাবিক। বিশ্বব্যাপী সাময়িকভাবে ভূমিকম্পের হার বাড়া মানেই বড় ভূমিকম্প আসন্ন — এমন নয়।
দীর্ঘমেয়াদি হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৬টি magnitude 7 বা তার বেশি মাত্রার বড় ভূমিকম্প প্রত্যাশিত। এর মধ্যে প্রায় ১৫টি magnitude 7-এর পরিসরে এবং প্রায় একটি magnitude 8 বা তার বেশি হতে পারে। কিন্তু কোনও বছর এই সংখ্যা গড়ের চেয়ে বেশি হতে পারে, আবার কোনও বছর কমও হতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, USGS জানিয়েছে, ২০১০ সালে magnitude 7 বা তার বেশি মাত্রার ২৩টি বড় ভূমিকম্প হয়েছিল। আবার ১৯৮৮ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৭টি। অর্থাৎ বছরভেদে উল্লেখযোগ্য ওঠানামা নতুন কোনো বিষয় নয়।
খবর বেশি পাওয়া যাচ্ছে কেন?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল প্রযুক্তির উন্নতি। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সিসমিক স্টেশন রয়েছে। ফলে ছোট ভূমিকম্পও দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
USGS জানিয়েছে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বছরে প্রায় ২০ হাজার ভূমিকম্প শনাক্ত ও অবস্থান নির্ণয় করা হয় — গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৫৫টি। আগের তুলনায় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং যোগাযোগ প্রযুক্তি উন্নত হওয়ায় মানুষও ভূমিকম্পের খবর অনেক দ্রুত জানতে পারছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। পৃথিবীর যে প্রান্তেই ভূমিকম্প হোক, কয়েক মিনিটের মধ্যে ভিডিও, ছবি ও খবর বিশ্বের অন্য প্রান্তে পৌঁছে যায়। ফলে একাধিক ভূমিকম্পের খবর একই দিনে বা একই সপ্তাহে সামনে এলে মানুষের কাছে ভূমিকম্পের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার অনুভূতি তৈরি হতে পারে।
বড় ভূমিকম্পের পর কেন আফটারশক হয়?
ইন্দোনেশিয়ার সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের পর বিপুল সংখ্যক আফটারশক রেকর্ড হয়েছে। এটি বড় ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ঘটনা। ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পটির পর প্রায় এক হাজারের কাছাকাছি আফটারশক রেকর্ড হওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
মূল ভূমিকম্পের সময় ফল্টের একটি অংশে বড় পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে আশপাশের শিলাস্তরে চাপের বণ্টন বদলে যায়। ভূত্বক নতুন ভারসাম্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করার সময় ছোট-বড় আরও কিছু কম্পন হতে পারে। এগুলিই আফটারশক।
সাধারণত মূল ভূমিকম্পের পর প্রথম দিকে আফটারশকের সংখ্যা বেশি থাকে এবং সময়ের সঙ্গে তা কমতে থাকে।
পরপর ভূমিকম্প কি বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস?
এই প্রশ্নের উত্তর হল — নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। ভূমিকম্পের ঝুঁকি সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘমেয়াদি হিসাব করতে পারেন। কোন অঞ্চলে সক্রিয় ফল্ট রয়েছে, অতীতে সেখানে কী ধরনের ভূমিকম্প হয়েছে এবং টেকটোনিক প্লেটের গতিবিধি কেমন — এসব বিশ্লেষণ করে ভূমিকম্পের ঝুঁকি নির্ধারণ করা সম্ভব।
কিন্তু নির্দিষ্ট করে বলা যে ‘আগামী কয়েক দিনের মধ্যে অমুক স্থানে অমুক মাত্রার ভূমিকম্প হবে’, এমন নির্ভুল পূর্বাভাস দেওয়ার প্রযুক্তি এখনও নেই। USGS-ও স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ভূমিকম্পের হার সাময়িকভাবে বাড়া বা কমা বড় ভূমিকম্প আসন্ন হওয়ার নির্ভরযোগ্য সংকেত নয়।
তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘একটার পর একটা ভূমিকম্প হচ্ছে, এবার আরও বড় ভূমিকম্প আসছে’ — এ ধরনের দাবিকে বৈজ্ঞানিক তথ্য হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে কি সম্পর্ক আছে?
ভূমিকম্পের মূল চালিকাশক্তি টেকটোনিক প্লেটের গতিবিধি। তাই সাম্প্রতিক কয়েকটি শক্তিশালী ভূমিকম্পকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল হিসেবে দেখার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
পৃথিবীর ভূত্বকে যে বিপুল শক্তি জমা হয়, তা মূলত প্লেটের দীর্ঘমেয়াদি গতিবিধি এবং ফল্টের ওপর চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে ভূমিকম্পের সামগ্রিক ব্যাখ্যায় টেকটোনিক প্রক্রিয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আতঙ্ক নয়, প্রস্তুতিই সবচেয়ে জরুরি
সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলোর পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো প্রস্তুতি। ভূমিকম্প কখন হবে তা নির্ভুলভাবে জানা না গেলেও ক্ষয়ক্ষতি কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে ভূমিকম্প-সহনশীল ভবন নির্মাণ, পুরনো ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা পরীক্ষা, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা এবং পরিবারের সদস্যদের ভূমিকম্পের সময় করণীয় সম্পর্কে প্রশিক্ষিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পকে পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। কিন্তু সঠিক নির্মাণনীতি, উন্নত নগর পরিকল্পনা, দ্রুত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং মানুষের সচেতনতা থাকলে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
কলম্বিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভানুয়াতুতে কাছাকাছি সময়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঘটনা অবশ্যই উদ্বেগের। কিন্তু এই তিনটি ঘটনা একসঙ্গে ঘটেছে বলেই পৃথিবীর ভূমিকম্পের হার হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে — এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
বরং ঘটনাগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছে, পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেট সবসময়ই সক্রিয় এবং বিশ্বের বহু অঞ্চল স্বাভাবিকভাবেই ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। USGS-এর দীর্ঘমেয়াদি তথ্যও দেখায়, বড় ভূমিকম্পের সংখ্যায় বছরভেদে স্বাভাবিক ওঠানামা রয়েছে।
তাই আতঙ্কের বদলে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক সচেতনতা। ভূমিকম্পের দিন-তারিখ আগে থেকে বলা সম্ভব না হলেও, ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর প্রস্তুতি আজই নেওয়া সম্ভব।

