ভারতের অভিজ্ঞ ব্যাটার অজিঙ্কা রাহানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। প্রায় দেড় দশকের ক্যারিয়ারে তিনি টেস্ট ক্রিকেটে পাঁচ হাজারের বেশি রান এবং ১২টি শতক করেছেন। ২০২০-২১ অস্ট্রেলিয়া সফরে তাঁর অধিনায়কত্বে ভারতের ঐতিহাসিক সিরিজ জয় ক্রিকেট ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। রাহানের বিদায়ে ভারতীয় ক্রিকেটের একটি গৌরবময় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।

ভারতের অভিজ্ঞ ব্যাটার অজিঙ্কা রাহানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। দীর্ঘ প্রায় দেড় দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টেনে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান। দেশের হয়ে খেলার সুযোগ পাওয়াকে জীবনের সবচেয়ে বড় সম্মান উল্লেখ করে রাহানে বলেন, ভারতের জার্সি গায়ে প্রতিটি মুহূর্ত তাঁর কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে রাহানের পথচলা শুরু হয় ২০১১ সালে। সীমিত ওভারের ক্রিকেট দিয়ে অভিষেক হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি টেস্ট দলের অন্যতম ভরসায় পরিণত হন। ধৈর্য, পরিমিত আক্রমণ এবং কঠিন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়ে ব্যাট করার ক্ষমতার কারণে তিনি আলাদা পরিচিতি গড়ে তোলেন। বিশেষ করে বিদেশের মাটিতে ভারতের সাফল্যের পেছনে তাঁর অবদান বহুবার প্রশংসিত হয়েছে।
ভারতীয় ক্রিকেটের সাম্প্রতিক ইতিহাসে রাহানের নাম উচ্চারিত হবে মূলত তাঁর নেতৃত্বের জন্য। ২০২০-২১ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়া সফরে নিয়মিত অধিনায়কের অনুপস্থিতিতে দলের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তিনি। সিরিজের প্রথম টেস্টে বড় ব্যবধানে হার এবং দলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটারের চোটে ছিটকে পড়ার পরও শান্ত নেতৃত্বে দলকে ঘুরে দাঁড় করান রাহানে। মেলবোর্নে তাঁর অনবদ্য শতরান এবং পুরো সিরিজে বিচক্ষণ অধিনায়কত্ব ভারতের অন্যতম স্মরণীয় টেস্ট সিরিজ জয়ের ভিত্তি তৈরি করে। ক্রিকেটবিশ্ব আজও সেই সাফল্যকে আধুনিক সময়ের সেরা প্রত্যাবর্তনগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করে।
রাহানের ব্যাটিংয়ের বৈশিষ্ট্য ছিল পরিস্থিতি বুঝে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতা। অনেক সময় তিনি দ্রুত রান তুলেছেন, আবার প্রয়োজনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্রিজে থেকে দলের ইনিংস গড়ে তুলেছেন। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো কঠিন কন্ডিশনে তাঁর বেশ কয়েকটি ইনিংস ভারতীয় ক্রিকেটের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতির অংশ হয়ে রয়েছে।
পরিসংখ্যানও তাঁর অবদানের সাক্ষ্য দেয়। ভারতের হয়ে তিনি ৮৫টি টেস্ট, ৯০টি ওয়ানডে এবং ২০টি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর সংগ্রহ পাঁচ হাজারের বেশি রান, যার মধ্যে রয়েছে ১২টি শতক ও ২৬টি অর্ধশতক। সীমিত ওভারের ক্রিকেটেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দলের হয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছেন। তবে লাল বলের ক্রিকেটেই তিনি নিজের সেরা পরিচয় তুলে ধরতে সক্ষম হন।
ক্যারিয়ারের শেষ কয়েক বছরে জাতীয় দলে নিয়মিত সুযোগ পাননি রাহানে। তরুণ ক্রিকেটারদের উত্থান এবং দলের পরিকল্পনায় পরিবর্তনের কারণে তিনি দীর্ঘ সময় জাতীয় দলের বাইরে ছিলেন। তবুও ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স বজায় রেখে জাতীয় দলে ফেরার চেষ্টা চালিয়ে যান। তাঁর পেশাদার মনোভাব এবং কঠোর পরিশ্রম তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য অনুকরণীয় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
অবসরের ঘোষণায় রাহানে তাঁর পরিবার, সতীর্থ, কোচ, নির্বাচক, সমর্থক এবং ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ক্রিকেট তাঁকে শুধু সাফল্যই দেয়নি, জীবনের মূল্যবান শিক্ষা ও অসংখ্য স্মরণীয় অভিজ্ঞতাও উপহার দিয়েছে। দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগকে তিনি নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন।
রাহানের অবসরের পর ক্রিকেটাঙ্গনে তাঁকে ঘিরে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সাবেক ও বর্তমান ক্রিকেটাররা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের প্রশংসা করেছেন। অনেকেই মনে করেন, পরিসংখ্যানের চেয়েও বেশি মূল্যায়ন করা উচিত তাঁর নেতৃত্ব, আত্মত্যাগ এবং দলের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার মানসিকতাকে। মাঠে শান্ত স্বভাব, শৃঙ্খলাবোধ এবং প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্যও তিনি বরাবরই প্রশংসিত ছিলেন।
যদিও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন, তবুও রাহানে ঘরোয়া ক্রিকেট কিংবা ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে ভবিষ্যতে খেলবেন কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো ঘোষণা দেননি। ফলে তাঁর ভক্তরা এখন অপেক্ষায় রয়েছেন ক্রিকেটজীবনের পরবর্তী অধ্যায় সম্পর্কে জানার জন্য।
ভারতীয় ক্রিকেটে এমন অনেক ক্রিকেটার রয়েছেন, যাঁদের অবদান শুধুমাত্র পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়। অজিঙ্কা রাহানে সেই তালিকারই একজন। নীরবে নিজের কাজ করে যাওয়া, দলের প্রয়োজনে সামনে এসে দায়িত্ব নেওয়া এবং কঠিন মুহূর্তে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তিনি সবসময় স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘটলেও ভারতীয় ক্রিকেটে তাঁর অবদান ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে।
রাহানের বিদায়ের মধ্য দিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো। তবে তাঁর নেতৃত্ব, বিদেশের মাটিতে স্মরণীয় ইনিংস এবং দেশের প্রতি নিবেদিত মনোভাব আগামী প্রজন্মের ক্রিকেটারদের জন্য দীর্ঘদিন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

