AI এর সাহায্যে গ্রহের বলয় থেকে নমুনা সংগ্রহে নাসার নতুন পরিকল্পনা

- Advertisement -

PRAXIS অভিযানের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (Artificial Intelligence বা AI) ব্যবহার। পৃথিবী থেকে শনি বা আরও দূরের গ্রহে একটি রেডিও সংকেত পৌঁছাতে অনেক সময় লাগে। ফলে পৃথিবী থেকে প্রতিটি নির্দেশ পাঠিয়ে অভিযান পরিচালনা করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই মহাকাশযানকে এমনভাবে তৈরি করার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে এটি নিজেই চারপাশের পরিবেশ বিশ্লেষণ করতে পারে।

গ্রহের বলয়

দূর থেকে তাকালে শনির বলয় যেন মহাকাশের বুকে আঁকা এক অপূর্ব শিল্পকর্ম। কিন্তু এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে এক বিপজ্জনক পরিবেশ। বরফ, পাথর ও ধুলিকণার অসংখ্য খণ্ড অবিশ্বাস্য গতিতে গ্রহটিকে প্রদক্ষিণ করছে। ক্ষুদ্র আকারের একটি কণাও এত দ্রুত ছুটে চলে যে তার সঙ্গে সংঘর্ষ হলে একটি মহাকাশযান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে বিজ্ঞানীদের বহুদিনের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এসব বলয়ের ভেতর থেকে সরাসরি নমুনা সংগ্রহ করা এখনো বড় একটি প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।

এই জটিল সমস্যার সমাধানে নতুন একটি ধারণাভিত্তিক অভিযানের পরিকল্পনা করছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। PRAXIS (Planetary Ring Access eXploration and In-Situ Science) নামের এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো সম্পূর্ণ মহাকাশযানকে ঝুঁকির মধ্যে না ফেলে গ্রহের বলয় থেকে নিরাপদ উপায়ে নমুনা সংগ্রহ করা। বিজ্ঞানীদের মতে, এই মিশন ভবিষ্যতে সৌরজগতের ইতিহাস সম্পর্কে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুনের মতো গ্রহগুলোর বলয় বহু দশক ধরে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের গবেষণার অন্যতম আকর্ষণ। একসময় ধারণা করা হতো, বলয়গুলো স্থায়ী কাঠামো। কিন্তু আধুনিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এগুলো ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। কোথাও নতুন কণা যুক্ত হচ্ছে, কোথাও আবার পুরোনো কণা ভেঙে যাচ্ছে বা হারিয়ে যাচ্ছে। তবে এই পরিবর্তনের প্রকৃত কারণ, বলয়ের বয়স, গঠন এবং উৎপত্তি সম্পর্কে এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানা। এসব প্রশ্নের সমাধান করতে হলে বলয়ের ভেতরের কণাগুলোকে সরাসরি পরীক্ষা করা জরুরি।

কিন্তু সেখানেই সবচেয়ে বড় বাধা। বলয়ের মধ্যে কয়েক মিলিমিটার আকারের একটি বরফখণ্ডও ঘণ্টায় হাজার হাজার কিলোমিটার গতিতে চলতে পারে। এমন গতিতে সংঘর্ষ হলে সেটি ছোট কোনো কণা নয়, কার্যত একটি উচ্চগতির ক্ষেপণাস্ত্রের মতো আচরণ করে। তাই পুরো মহাকাশযানকে বলয়ের ভেতর প্রবেশ করানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যয়বহুল।

এই সমস্যার সমাধানে নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির (JPL) গবেষকেরা একটি অভিনব প্রযুক্তিগত কৌশল প্রস্তাব করেছেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মহাকাশযানটি বলয়ের বাইরে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করবে। এরপর সেখান থেকে একটি দীর্ঘ, নমনীয় ও বিশেষভাবে নকশা করা রোবোটিক বাহু অল্প সময়ের জন্য বলয়ের ভেতরে প্রবেশ করবে। বাহুর অগ্রভাগে থাকা বিশেষ সংগ্রাহক যন্ত্র বরফ, ধুলিকণা কিংবা ক্ষুদ্র পাথরের নমুনা সংগ্রহ করে দ্রুত আবার মূল মহাকাশযানে ফিরে আসবে। ফলে পুরো যানকে বিপজ্জনক অঞ্চলে প্রবেশ করতে হবে না এবং মিশনের ঝুঁকিও অনেক কমে যাবে।

এই পদ্ধতিকে অনেকটা উঁচু গাছে না উঠে লম্বা দণ্ড দিয়ে ফল পেড়ে আনার সঙ্গে তুলনা করা যায়। লক্ষ্যবস্তুর কাছে পৌঁছানো হচ্ছে, কিন্তু নিজেকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে না। মহাকাশ গবেষণায় এই ধরনের কৌশল ভবিষ্যতের অনেক অভিযানের জন্যও নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।

PRAXIS অভিযানের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (Artificial Intelligence বা AI) ব্যবহার। পৃথিবী থেকে শনি বা আরও দূরের গ্রহে একটি রেডিও সংকেত পৌঁছাতে অনেক সময় লাগে। ফলে পৃথিবী থেকে প্রতিটি নির্দেশ পাঠিয়ে অভিযান পরিচালনা করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই মহাকাশযানকে এমনভাবে তৈরি করার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে এটি নিজেই চারপাশের পরিবেশ বিশ্লেষণ করতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় মহাকাশযান আশপাশের কণার অবস্থান, গতি এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি নির্ণয় করবে। প্রয়োজন হলে নিজেই নিরাপদ পথ বেছে নেবে, সংঘর্ষ এড়াবে এবং কখন নমুনা সংগ্রহ করা সবচেয়ে উপযুক্ত হবে, সেই সিদ্ধান্তও স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিতে পারবে। এর ফলে শুধু অভিযানের নিরাপত্তাই বাড়বে না, বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহের দক্ষতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

নমুনা সংগ্রহের পাশাপাশি মহাকাশযানে থাকা ক্ষুদ্র বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি কণাগুলোর আকার, ঘনত্ব, অভ্যন্তরীণ গঠন এবং রাসায়নিক উপাদান প্রাথমিকভাবে সেখানেই বিশ্লেষণ করবে। এতে পৃথিবীতে তথ্য পৌঁছানোর আগেই গবেষকেরা গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য সম্পর্কে ধারণা পেতে পারবেন। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি ধূমকেতু, গ্রহাণু কিংবা অন্য মহাজাগতিক বস্তুর ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

২০২৬ সালে নাসার NASA Innovative Advanced Concepts (NIAC) কর্মসূচির প্রথম ধাপের অর্থায়ন লাভ করেছে PRAXIS প্রকল্প। বর্তমানে গবেষকেরা এর প্রযুক্তিগত সম্ভাব্যতা, কম্পিউটারভিত্তিক সিমুলেশন, রোবোটিক বাহুর কার্যক্ষমতা এবং স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। প্রকল্পটি পরবর্তী ধাপের অনুমোদন পেলে বাস্তব প্রোটোটাইপ তৈরি, পরীক্ষামূলক মিশন এবং ভবিষ্যৎ মহাকাশ অভিযানের প্রস্তুতি শুরু হবে।

বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, এই মিশন সফল হলে শুধু শনির বলয়ের উৎপত্তি বা গঠন সম্পর্কেই নয়, সৌরজগতের গ্রহগুলোর জন্ম, বিবর্তন এবং কোটি কোটি বছর ধরে চলা মহাজাগতিক পরিবর্তনের ইতিহাস সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ নতুন তথ্য জানা সম্ভব হবে। ক্ষুদ্র বরফ ও পাথরের কণার মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে গ্রহ তৈরির প্রাথমিক উপাদানের ইতিহাস, যা সৌরজগতের অতীতকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করবে।

মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে প্রতিটি নতুন প্রযুক্তি মানুষের জ্ঞানের সীমানা আরও বিস্তৃত করেছে। PRAXIS-ও তেমনই একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ, যা ভবিষ্যতে শুধু গ্রহের বলয় নয়, সমগ্র মহাবিশ্বকে বোঝার ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -