ভারত থেকে কোরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত মেঘ ও বৃষ্টিবলয় নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও এটি সরাসরি নিম্নচাপ অক্ষরেখা নয়। আবহাওয়াবিদদের মতে, মৌসুমি বায়ু, একাধিক নিম্নচাপ, ট্রাফ ও আর্দ্র বায়ুপ্রবাহের সম্মিলিত প্রভাবে এই দীর্ঘ বৃষ্টিবলয় তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।

সম্প্রতি স্যাটেলাইট চিত্রে ভারত থেকে শুরু করে বাংলাদেশ, মিয়ানমার, দক্ষিণ চীন এবং কোরীয় উপদ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত একটি দীর্ঘ মেঘ ও বৃষ্টির ব্যান্ড নজরে এসেছে। এই দৃশ্য প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই দাবি করছেন, ভারত থেকে কোরিয়া পর্যন্ত একটি বিশাল নিম্নচাপ অক্ষরেখা তৈরি হয়েছে। তবে আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এই ব্যাখ্যা পুরোপুরি সঠিক নয়।
এটি কি সত্যিই নিম্নচাপ অক্ষরেখা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের Monsoon Trough বা মৌসুমি নিম্নচাপ অক্ষরেখা সাধারণত উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে গাঙ্গেয় সমভূমি হয়ে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। এটি সরাসরি কোরিয়া পর্যন্ত প্রসারিত হয়নি।
বর্তমানে যা দেখা যাচ্ছে, তা মূলত একটি বৃহৎ মৌসুমি বৃষ্টিবলয় (Monsoon Rain Band) বা Monsoon Convergence Zone, যেখানে একাধিক নিম্নচাপ ব্যবস্থা, ট্রাফ, ঘূর্ণাবর্ত এবং আর্দ্র বায়ুপ্রবাহ মিলিত হয়ে বিশাল মেঘমালা তৈরি করেছে।
কেন এত দীর্ঘ মেঘের ব্যান্ড তৈরি হয়েছে?
আবহাওয়া বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে —
- বঙ্গোপসাগর থেকে বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প উত্তর-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হচ্ছে।
- আরব সাগর থেকেও মৌসুমি বায়ু শক্তিশালী রয়েছে।
- দক্ষিণ চীন সাগর ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের আর্দ্র বায়ু পূর্ব এশিয়ার আবহাওয়াকে প্রভাবিত করছে।
- একাধিক নিম্নচাপ ও ট্রাফ পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে একটি দীর্ঘ বৃষ্টিবলয় তৈরি করেছে।
ফলে ভারত থেকে কোরিয়া পর্যন্ত প্রায় অবিচ্ছিন্ন মেঘের ব্যান্ড স্যাটেলাইট চিত্রে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
কোন কোন দেশে প্রভাব পড়তে পারে?
এই বৃহৎ মৌসুমি ব্যবস্থার প্রভাবে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে —
- ভারত
- বাংলাদেশ
- মিয়ানমার
- দক্ষিণ চীন
- দক্ষিণ কোরিয়া
- জাপানের কিছু অঞ্চল
স্থানভেদে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত, জলাবদ্ধতা এবং পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকিও থাকতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আছে কি?
বিজ্ঞানীদের মতে, উষ্ণ সমুদ্রপৃষ্ঠের কারণে বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে অনেক সময় মৌসুমি বৃষ্টিব্যবস্থা আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। তবে একটি নির্দিষ্ট আবহাওয়া ঘটনাকে শুধুমাত্র জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। এ ধরনের ঘটনার পেছনে মৌসুমি বায়ুর স্বাভাবিক ওঠানামা, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা এবং বায়ুমণ্ডলের বৃহৎ-পরিসরের প্রবাহও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আবহাওয়াবিদদের পরামর্শ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত স্যাটেলাইট ছবির ভিত্তিতে বিভ্রান্তিকর সিদ্ধান্তে না পৌঁছে সংশ্লিষ্ট দেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং আন্তর্জাতিক আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুসরণ করা উচিত।
সব মিলিয়ে, ভারত থেকে কোরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত যে দীর্ঘ মেঘ ও বৃষ্টিবলয় দেখা যাচ্ছে, তা একটি সক্রিয় মৌসুমি আবহাওয়াগত ব্যবস্থা। তবে এটিকে ভারতের নিম্নচাপ অক্ষরেখা সরাসরি কোরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে — এভাবে ব্যাখ্যা করা সঠিক নয়। বরং এটি একাধিক নিম্নচাপ, ট্রাফ এবং আর্দ্র মৌসুমি বায়ুর সম্মিলিত প্রভাবে গঠিত একটি বৃহৎ বৃষ্টিবলয়, যা দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার আবহাওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।

