অনেকে মনে করেন, বর্তমানে ইজরায়েল আন্তর্জাতিকভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। বাস্তব চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, জাতিসংঘ এবং বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা ইসরায়েলের নীতির কঠোর সমালোচনা করেছে। তবে সমালোচনা এবং কূটনৈতিক মতভেদের অর্থ এই নয় যে সব ধরণের সহযোগিতা বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা সম্পর্ক এখনও বহাল রয়েছে।

ইজরায়েলকে ঘিরে একটি সাধারণ প্রশ্ন বারবার ওঠে — মাত্র প্রায় এক কোটিরও কম জনসংখ্যার একটি ছোট রাষ্ট্র কীভাবে একাধিক ফ্রন্টে দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে? যেখানে রাশিয়ার মতো বড় এবং প্রযুক্তিতে উন্নত বৃহৎশক্তি তুলনায় ইউক্রেনের মতো ছোট দেশের মোকাবিলা করতে হিমশিম খাচ্ছে সেখানে ইজরায়েল একাই ইরানসহ একাধিক দেশের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেনের সঙ্গে যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলির দরাজ সাহায্য রয়েছে তেমনটা কিন্তু ইজরায়েলের পিছনে নেই। অনেকের কাছে এটি রহস্যময় বলে মনে হলেও বাস্তবে এর পেছনে রয়েছে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, সামরিক পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির সমন্বিত প্রভাব। ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি আরব দেশগুলির সঙ্গে ইজরায়েলের ভয়ংকর যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত ইজরায়েলের জয়লাভ। কিন্তু এই যুদ্ধ তার চেয়েও বেশি সময় স্থায়ী হতে যাচ্ছে। কাজেই কোন মন্ত্রে ইজরায়েল এখনও যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে!!
প্রথমত, ইজরায়েলের অর্থনীতি তার সামরিক শক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (GDP) আয়তন বা জনসংখ্যার তুলনায় অত্যন্ত উচ্চ। তথ্যপ্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং উচ্চমূল্যের প্রযুক্তি রপ্তানি ইজরায়েলের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। তার ওপর সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা ইহুদী জনগোষ্ঠী যার মধ্যে বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ এবং বড় বড় কোম্পানির মালিকেরা রয়েছেন, তারা সবাই একজন দেশপ্রেমী নাগরিক হিসেবে ইজরায়েলকে আর্থিকভাবে নিরন্তর সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। তবে যুদ্ধের সময় অর্থনীতি অবশ্যই চাপের মুখে পড়ে, পর্যটন, বিনিয়োগ ও উৎপাদনে ক্ষতি হয়; কিন্তু উচ্চ উৎপাদনশীলতা, শক্তিশালী করব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের কারণে সেই চাপ কিছুটা হলেও সামাল দেওয়া সম্ভব হয়। কিন্তু এটাও সত্য যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ যে কোনও অর্থনীতির জন্যই ক্ষতিকর, এবং ইজরায়েলও এর ব্যতিক্রম নয়। বিশেষ করে যুদ্ধ পরবর্তী পুনর্গঠনের সময় বিষয়টি রীতিমত অনুভব করতে পারবে ইজরায়েল।
দ্বিতীয়ত, ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা শিল্প বিশ্বের অন্যতম উন্নত। দেশটি নিজেই উন্নত ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার, সাইবার প্রযুক্তি, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন ধরণের গোলাবারুদ উৎপাদন করে। ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জামের জন্য তারা সম্পূর্ণভাবে বিদেশের ওপর নির্ভরশীল নয়। তবে যুদ্ধবিমান, কিছু ভারী অস্ত্র, নির্দিষ্ট ধরণের ক্ষেপণাস্ত্র এবং গোলাবারুদের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও সরবরাহ এখনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ “সম্পূর্ণ স্বনির্ভর” বলার সুযোগ নেই, বরং “উচ্চমাত্রায় সক্ষম” বলা বেশি যথার্থ।
তৃতীয়ত, খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নেও ইসরায়েল একটি বিশেষ উদাহরণ। দেশের চাষযোগ্য জমি সীমিত হলেও তারা ড্রিপ ইরিগেশন, গ্রিনহাউস কৃষি, লবণাক্ত জল বিশুদ্ধকরণ, পুনর্ব্যবহৃত জল ব্যবহার এবং উচ্চফলনশীল কৃষি প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন বাড়িয়েছে। পাশাপাশি গম, ভুট্টা, পশুখাদ্যসহ বহু খাদ্যপণ্য আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি করা হয়। তাই সীমিত কৃষিজমি থাকা সত্ত্বেও দেশটি খাদ্য সরবরাহ বজায় রাখতে সক্ষম হয়। অর্থাৎ খাদ্য নিরাপত্তা শুধু জমির পরিমাণের ওপর নয়, প্রযুক্তি ও বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপরও নির্ভর করে।
চতুর্থত, আধুনিক যুদ্ধ পরিচালনার জন্য জ্বালানি, কাঁচামাল ও খনিজের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ প্রয়োজন। ইজরায়েলের নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত হলেও পূর্ব ভূমধ্যসাগরে প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে তেল, ধাতু এবং বহু শিল্পকাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। যুদ্ধকালেও সমুদ্রবন্দর, বাণিজ্যিক চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খল সচল রাখার চেষ্টা করা হয়।
পঞ্চমত, ইসরায়েলের সামরিক নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ এবং শক্তিশালী রিজার্ভ বাহিনী। প্রয়োজন হলে অল্প সময়ে লক্ষাধিক প্রশিক্ষিত নাগরিককে সেনাবাহিনীতে যুক্ত করা সম্ভব। এমনকি মেয়েদের ক্ষেত্রেও সামরিক প্রশিক্ষণ নেওয়া বাধ্যতামূলক। এর ফলে ছোট জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও কার্যকর সামরিক সক্ষমতা বজায় রাখা যায়। একই সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সাইবার যুদ্ধ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সামরিক প্রযুক্তি তাদের কার্যকারিতা বাড়িয়ে দেয়।
অনেকে মনে করেন, বর্তমানে ইজরায়েল আন্তর্জাতিকভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। বাস্তব চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, জাতিসংঘ এবং বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা ইসরায়েলের নীতির কঠোর সমালোচনা করেছে। তবে সমালোচনা এবং কূটনৈতিক মতভেদের অর্থ এই নয় যে সব ধরণের সহযোগিতা বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা সম্পর্ক এখনও বহাল রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও অনেক ক্ষেত্রে ইজরায়েলকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানায়, বিশেষ করে বেসামরিক হতাহতের বিষয়টি নিয়ে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইজরায়েলের নিরাপত্তার প্রতি তার দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতিও বজায় রেখেছে। ফলে সম্পর্কের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও সহযোগিতা পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে — এমনটি বলা সঠিক হবে না।
সবশেষে বলা যায়, ইজরায়েলের দীর্ঘদিন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পেছনে কোনও অলৌকিক রহস্য নেই। এর ভিত্তি হল বহু দশক ধরে গড়ে তোলা শক্তিশালী অর্থনীতি, উচ্চ প্রযুক্তি নির্ভর প্রতিরক্ষা শিল্প, উন্নত কৃষি ও জলব্যবস্থা, কার্যকর রিজার্ভ বাহিনী, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতা। তবে একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মূল্য অত্যন্ত বেশি। ইতিমধ্যেই মৃত এবং যুদ্ধে পঙ্গু হয়ে যাওয়া জনসংখ্যা ইজরায়েলে বাড়তে শুরু করেছে। ফলে অর্থনৈতিক ক্ষতি, প্রাণহানি, সামাজিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক চাপ — এসবের প্রভাব শেষ পর্যন্ত যে কোনও রাষ্ট্রকেই বহন করতে হয়। তাই সামরিক সক্ষমতা যতই শক্তিশালী হোক, স্থায়ী শান্তি ও কূটনৈতিক সমাধানই শেষ পর্যন্ত একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির সবচেয়ে কার্যকর ভিত্তি।

