জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ, সামনে কী কী চ্যালেঞ্জ?

- Advertisement -

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদের দাবিতে ভারতের কূটনৈতিক তৎপরতা নতুন গতি পেয়েছে। G4 জোটের সক্রিয়তা এবং হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্রের সমর্থন ভারতের অবস্থানকে আরও জোরালো করেছে। তবে ভেটো ক্ষমতা, নিরাপত্তা পরিষদের সম্প্রসারণ এবং জাতিসংঘ সনদ সংশোধন নিয়ে এখনও মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক সমর্থন বাড়লেও ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ এখনও নিশ্চিত হয়নি।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ, সামনে কী কী চ্যালেঞ্জ?

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার জন্য ভারতের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় ফের গতি এসেছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের দাবির পাশে দাঁড়িয়েছে মধ্য ইউরোপের চারটি দেশ। একই সঙ্গে ভারত, ব্রাজিল, জার্মানি ও জাপানকে নিয়ে গঠিত G4 জোট নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোগত সংস্কারের দাবিতে নতুন করে সক্রিয় হয়েছে। ফলে স্থায়ী সদস্যপদের প্রশ্নে ভারতের কূটনৈতিক তৎপরতা আগের তুলনায় আরও জোরালো হয়েছে। তবে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত থেকে অনেকটাই দূরে রয়েছে নয়াদিল্লি।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বর্তমানে মোট ১৫টি সদস্যদেশ রয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চিন, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য – এই পাঁচটি দেশ স্থায়ী সদস্য এবং তাদের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। বাকি ১০টি দেশ অস্থায়ী সদস্য হিসেবে দুই বছরের জন্য নির্বাচিত হয়। ভারতের দাবি হল, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্য অনুযায়ী নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল করা প্রয়োজন।

চার ইউরোপীয় দেশের সমর্থন

ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের দাবিতে সাম্প্রতিক সময়ে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল Visegrád Group বা V4-এর সমর্থন। হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া এবং চেক প্রজাতন্ত্র — এই চার দেশ নিয়ে গঠিত V4 প্রথমবারের মতো ভারতকে নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করে। ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত সেই বৈঠকের পর চার দেশই ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের দাবির প্রতি সমর্থন জানায়।

স্লোভাকিয়ার বিদেশমন্ত্রী জুরাজ ব্লানার বলেন, গ্লোবাল সাউথের গুরুত্বপূর্ণ দেশ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের উদীয়মান শক্তি হিসেবে ভারতের জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোয় জায়গা থাকা উচিত। এই সমর্থন ভারতের জন্য নতুন কূটনৈতিক সমর্থন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সক্রিয় G4 জোট

স্থায়ী সদস্যপদের দাবিতে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হল G4। ভারত ছাড়াও এই জোটে রয়েছে ব্রাজিল, জার্মানি এবং জাপান। চার দেশই নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ও অস্থায়ী — দুই ধরনের সদস্যপদ সম্প্রসারণের পক্ষে।

২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নিউইয়র্কে G4-এর বিদেশমন্ত্রীদের বৈঠক হয়। সেখানে নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার নিয়ে আন্তঃসরকারি আলোচনা বা Intergovernmental Negotiations-এর অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। বৈঠকে G4 দেশগুলি জানায়, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার আগের চেয়ে আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।

G4-এর বক্তব্য, বিশ্বের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামোর যথেষ্ট ফারাক রয়েছে। তাই পরিষদকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল, কার্যকর এবং আধুনিক করার প্রয়োজন রয়েছে।

ভেটো ক্ষমতা নিয়ে জটিলতা

তবে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলির একটি হল ভেটো ক্ষমতা। নতুন স্থায়ী সদস্যরা বর্তমান পাঁচ স্থায়ী সদস্যের মতো ভেটো ক্ষমতা পাবেন কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

G4 একটি সমঝোতার প্রস্তাব সামনে এনেছে। সেই প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন স্থায়ী সদস্যরা নির্দিষ্ট একটি পর্যালোচনা সময় পর্যন্ত ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার না করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। ভারতের পক্ষ থেকেও এই ধরনের একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন রয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

অন্যদিকে, রাশিয়া নিরাপত্তা পরিষদে নতুন স্থায়ী সদস্য যুক্ত করার ধারণাকে সমর্থন করলেও বর্তমান ভেটো ব্যবস্থাকে বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে। ফলে নতুন সদস্যদের অধিকার ও ভেটো ক্ষমতা নিয়ে ঐকমত্য তৈরি করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।

চিনের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ

ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের দাবির ক্ষেত্রে চিনের অবস্থান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান পাঁচ স্থায়ী সদস্যের মধ্যে চিনই একমাত্র এশীয় দেশ, এবং নতুন স্থায়ী সদস্য যুক্ত করতে হলে জাতিসংঘ সনদ সংশোধনের মতো জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

ভারতের দাবির প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আঞ্চলিক গোষ্ঠীর সমর্থন বাড়লেও, সব পক্ষের মধ্যে ঐকমত্য এখনও তৈরি হয়নি। নিরাপত্তা পরিষদের সম্প্রসারণের পাশাপাশি আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব নিয়েও পৃথক দাবি রয়েছে। G4 সম্প্রতি আফ্রিকার স্থায়ী প্রতিনিধিত্বের দাবির প্রতিও সমর্থন জানিয়েছে।

ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান

ভারত বহু বছর ধরে যুক্তি দিয়ে আসছে যে বিশ্বের বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশগুলির একটি, বড় অর্থনীতি এবং গ্লোবাল সাউথের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে তার আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোয় আরও বড় ভূমিকা থাকা উচিত। নিরাপত্তা পরিষদের নির্বাচিত অস্থায়ী সদস্য হিসেবেও ভারত একাধিকবার দায়িত্ব পালন করেছে। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারত এখনও পর্যন্ত আটবার অস্থায়ী সদস্য হিসেবে পরিষদে কাজ করেছে।

এই অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখেই ভারত স্থায়ী সদস্যপদের দাবি আরও জোরদার করছে। পাশাপাশি G4-এর সঙ্গে সমন্বয়, আফ্রিকার প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে সমর্থন এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে বৃহত্তর ঐকমত্য গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।

কতটা এগোল ভারত?

সব মিলিয়ে বলা যায়, ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের দাবি কূটনৈতিক সমর্থনের দিক থেকে নতুন গতি পেয়েছে, বিশেষ করে V4-এর চার দেশের সাম্প্রতিক সমর্থন এবং G4-এর সক্রিয়তার কারণে। তবে এটিকে এখনও স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার চূড়ান্ত অগ্রগতি বলা যাবে না।

কারণ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যসংখ্যা ও কাঠামো পরিবর্তনের জন্য জাতিসংঘের সংস্কার প্রক্রিয়ায় ব্যাপক ঐকমত্য প্রয়োজন। স্থায়ী সদস্যপদ, ভেটো ক্ষমতা, আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্ব এবং নতুন সদস্যদের অধিকার — প্রতিটি বিষয়েই বিভিন্ন দেশের আলাদা অবস্থান রয়েছে।

অর্থাৎ, ভারতের সামনে এখন মূল লক্ষ্য হল সমর্থনের পরিধি আরও বাড়ানো এবং নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের বিষয়ে সদস্য দেশগুলির মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতা তৈরি করা। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিস্থিতি বলছে, ভারতের দাবির পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থনের পরিধি বাড়ছে, কিন্তু স্থায়ী আসন এখনও নিশ্চিত হয়নি।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -