রুশ তেল কেনা নিয়ে ভারতের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে আমেরিকা। মার্কিন কংগ্রেসের পাস করা নতুন বিলে রাশিয়ার বড় তেল ক্রেতা দেশগুলির পণ্যে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভারত জানিয়েছে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। রুশ তেলের আমদানি কমলে আন্তর্জাতিক বাজারেও জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা নিয়ে ভারত ও আমেরিকার মধ্যে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। রুশ তেল আমদানিকারক দেশগুলির বিরুদ্ধে আরও কঠোর বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নেওয়ার পথ খুলে দিয়েছে মার্কিন কংগ্রেসে পাস হওয়া একটি নতুন বিল। এই আইনি ব্যবস্থার আওতায় রাশিয়ার জ্বালানি কিনতে থাকা দেশগুলির ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দেওয়া হতে পারে। ভারত ও চিন — রাশিয়ার বড় তেল ক্রেতা। এই ব্যবস্থার সম্ভাব্য প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ভারতের পণ্যের ওপর এখনই ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হয়নি; বিলটি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এমন ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়ার পথ তৈরি করেছে।
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ ১৬ সেপ্টেম্বর ‘Lindsey O. Graham Sanctioning Russia and Iran Act of 2026’ অনুমোদন করেছে। এর আগে বিলটি মার্কিন সেনেটেও অনুমোদিত হয়েছিল। এবার পরবর্তী প্রক্রিয়ার জন্য এটি হোয়াইট হাউসে যাচ্ছে। এই আইনের লক্ষ্য মূলত রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো এবং দেশটির তেল ও গ্যাস থেকে আয় কমানোর মাধ্যমে ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থনৈতিক ভিত্তিতে চাপ সৃষ্টি করা।
ভারতের কড়া বার্তা
মার্কিন কংগ্রেসের এই পদক্ষেপের পর ভারতের বিদেশ মন্ত্রক স্পষ্ট করেছে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কোনওভাবেই উপেক্ষা করা হবে না। নয়াদিল্লি জানিয়েছে, ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে ভারত বাজারের পরিস্থিতি অনুযায়ী বিভিন্ন উৎস থেকে তেল সংগ্রহের নীতি বজায় রাখবে।
বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার সময় ভারত এই আইনের সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরেছে। নয়াদিল্লি জানিয়েছে, নতুন মার্কিন পদক্ষেপ ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে। একইসঙ্গে ভারত তার বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে।
অর্থাৎ, ভারতের অবস্থান হল, রাশিয়া থেকে তেল কেনার সিদ্ধান্ত শুধু কোনও একটি দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয় নয়; দেশের বিপুল জ্বালানি চাহিদা, তেলের দাম এবং সরবরাহের স্থিতিশীলতার সঙ্গেও এটি সরাসরি যুক্ত।
রাশিয়ার তেলের ওপর ভারতের নির্ভরতা কতটা?
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পশ্চিমা দেশগুলির নিষেধাজ্ঞায় রুশ তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবাহে বড় পরিবর্তন আসে। সেই সময় ভারতীয় রিফাইনারিগুলি তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয় দামে রুশ অপরিশোধিত তেল কেনা বাড়ায়। ফলে কয়েক বছরের মধ্যে রাশিয়া ভারতের অন্যতম প্রধান অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী হয়ে ওঠে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৫০.৮ শতাংশ রাশিয়া থেকে এসেছিল বলে বাণিজ্য-সংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে Reuters জানিয়েছিল। ওই মাসে রাশিয়া থেকে ভারতের আমদানি ছিল প্রায় ২৪.৭ লক্ষ ব্যারেল প্রতিদিন।
তবে আগস্টে রুশ তেল আমদানির পরিমাণ কিছুটা কমেছে। একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জুলাইয়ের প্রায় ২.৮২ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিন থেকে আগস্টে তা কমে প্রায় ২.০৮ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিন হয়েছে। একই সময়ে ভারতের মোট তেল আমদানিতে রাশিয়ার অংশও প্রায় ৪৫ শতাংশে নেমেছে।
এর অর্থ হল ভারত রুশ তেলের ওপর নির্ভরতা একেবারে ছেড়ে দেয়নি, কিন্তু বাজারের পরিস্থিতি অনুযায়ী আমদানির পরিমাণে পরিবর্তন হচ্ছে।
১০০ শতাংশ শুল্ক হলে কী প্রভাব পড়তে পারে?
নতুন মার্কিন আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সম্ভাব্য শুল্কের মাত্রা। মার্কিন প্রশাসন যদি আইনটির আওতায় ভারতের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শুল্ক আরোপ করে, তাহলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে আমেরিকার বাজারে ভারতীয় পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে।
ভারত থেকে আমেরিকায় যাওয়া পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক বসলে সেগুলির দাম মার্কিন বাজারে বেড়ে যেতে পারে। ফলে ভারতীয় রফতানিকারকদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। একইসঙ্গে ভারত-মার্কিন বাণিজ্য আলোচনা আরও জটিল হতে পারে।
তবে সম্ভাব্য প্রভাব কতটা হবে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। কারণ মার্কিন প্রশাসন আদৌ এই ক্ষমতা ব্যবহার করবে কি না, করলে কত শতাংশ শুল্ক বসাবে, কোন কোন পণ্যের ওপর তা কার্যকর হবে এবং কবে থেকে হবে — এসব বিষয় এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
তেলের বাজার নিয়েও উদ্বেগ
ভারতের জন্য সমস্যাটি শুধু আমেরিকায় রফতানির সম্ভাব্য ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রুশ তেলের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের বাজারেও চাপ বাড়তে পারে।
ভারতীয় রিফাইনারিগুলির সূত্রকে উদ্ধৃত করে Reuters জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের জন্য ভারতীয় সংস্থাগুলি ইতিমধ্যেই রুশ তেল-সহ বিভিন্ন উৎস থেকে সরবরাহের ব্যবস্থা করেছে। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধজনিত কারণে আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় রুশ তেলের ওপর নতুন বিধিনিষেধ এলে জ্বালানি খরচ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রিফাইনারিগুলির একটি অংশ তাই মার্কিন প্রশাসনের কাছে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে কিছুটা সময় বা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রুশ তেল কেনার সুযোগ দেওয়ার মতো সমাধানের পক্ষে সওয়াল করছে বলে Reuters জানিয়েছে।
ভারত কি রুশ তেল কেনা বন্ধ করবে?
এই মুহূর্তে এমন কোনও সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেয়নি নয়াদিল্লি। বরং বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে ভারত জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে বহুমুখী উৎসের নীতি বজায় রাখতে চায়। অর্থাৎ রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আমেরিকা এবং অন্যান্য উৎপাদক দেশের কাছ থেকে বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী তেল সংগ্রহ করার কৌশল অব্যাহত থাকতে পারে।
ভারতের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হল, একদিকে সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, অন্যদিকে আমেরিকার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা। রুশ তেল নিয়ে মার্কিন চাপ সেই ভারসাম্যকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
ভারত-মার্কিন বাণিজ্য আলোচনাতেও প্রভাবের আশঙ্কা
রুশ তেল ইস্যুটি এমন সময়ে সামনে এসেছে যখন ভারত ও আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা চলছে। নতুন মার্কিন শুল্কের হুমকি সেই আলোচনাকে আরও জটিল করতে পারে বলে ভারতীয় বাণিজ্য বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন।
তবে ভারতের পক্ষ থেকে এখনও আলোচনার দরজা বন্ধ করার কোনও ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি। বরং সরকার বাণিজ্য ও শিল্প সংস্থাগুলির সঙ্গে সমন্বয় করে নতুন মার্কিন আইনের সম্ভাব্য প্রভাব পর্যালোচনা করার কথা জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে, রুশ তেল নিয়ে ভারত-মার্কিন টানাপোড়েন এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। মার্কিন কংগ্রেসের নতুন আইন ভারতের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে দেয়নি, কিন্তু ভবিষ্যতে এমন ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে তুলে দিতে পারে। অন্যদিকে ভারত স্পষ্ট করেছে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে তারা প্রস্তুত।
আগামী দিনে মূল নজর থাকবে—মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইনটি কীভাবে প্রয়োগ করেন, ভারতের রুশ তেল আমদানির পরিমাণ কতটা বদলায় এবং দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনায় এর কী প্রভাব পড়ে।

