BRICS-এ ভারতের বাজিমাত! Global South থেকে বাণিজ্য — কী পেল নয়াদিল্লি?

- Advertisement -

দিল্লিতে অনুষ্ঠিত BRICS সম্মেলন ভারতের জন্য সরাসরি আর্থিক প্যাকেজের বদলে কূটনৈতিক ও কৌশলগত সাফল্য এনে দিয়েছে। Global South-এর নেতৃত্বে ভারতের অবস্থান শক্ত হয়েছে। স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা, AI, স্বাস্থ্য, critical minerals ও supply chain সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ভারত-চীন সম্পর্কেও আলোচনার সুযোগ বেড়েছে। এখন এসব উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই হবে মূল পরীক্ষা।

BRICS-এ ভারতের বাজিমাত! Global South থেকে বাণিজ্য — কী পেল নয়াদিল্লি?

নয়াদিল্লিতে সদ্য শেষ হওয়া ১৮তম BRICS সম্মেলন ভারতের কাছে শুধুমাত্র একটি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আয়োজন ছিল না। এই সম্মেলনকে ঘিরে ভারতের মূল লক্ষ্য ছিল — বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতিগুলির মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো, Global South-এর কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নয়াদিল্লির প্রভাব আরও বাড়ানো। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের শেষে গৃহীত হয়েছে ‘New Delhi Declaration’। সেখানে আন্তর্জাতিক শান্তি, বহুপাক্ষিকতা, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা-সহ একাধিক বিষয়ে সদস্য দেশগুলির অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।

তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন একটাই — এই সম্মেলন থেকে ভারত বাস্তবে কী পেল? কোনও বড় আর্থিক প্যাকেজ, নতুন ঋণ বা সরাসরি বিনিয়োগের ঘোষণা নয়; বরং ভারতের অর্জনের বড় অংশ কূটনৈতিক এবং কৌশলগত। ভবিষ্যতে সেগুলি বাস্তব অর্থনৈতিক সুবিধায় পরিণত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বড় সাফল্য

ভারতের অন্যতম বড় সাফল্য হল, ভিন্নমত ও বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের দেশগুলিকে একসঙ্গে রেখে একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে ঐকমত্য তৈরি করা। BRICS এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। ভারত, চীন ও রাশিয়ার পাশাপাশি ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, মিশর, ইথিওপিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশও এই সম্প্রসারিত গোষ্ঠীর অংশ।

এমন একটি সময়ে, যখন পশ্চিম এশিয়ায় তীব্র উত্তেজনা চলছে এবং সদস্য দেশগুলির মধ্যেও বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে, ঐকমত্যে পৌঁছানো ভারতের সভাপতিত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ইরান ও UAE-র মধ্যে মতপার্থক্যের মধ্যেও সম্মেলনের যৌথ অবস্থান তৈরি হওয়া নয়াদিল্লির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গ্রহণযোগ্যতাকে বাড়িয়েছে।

Global South-এর নেতৃত্বে ভারতের অবস্থান আরও শক্ত

BRICS-কে ভারত শুধু একটি অর্থনৈতিক গোষ্ঠী হিসেবে দেখাতে চায়নি। নয়াদিল্লি বারবার Global South-এর উন্নয়নশীল দেশগুলির সমস্যা ও স্বার্থকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে আনার চেষ্টা করেছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্মেলনে স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তি এবং উন্নয়ন নিয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, BRICS-এর শক্তি শুধু সদস্য দেশের সংখ্যায় নয়, বরং বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলির আস্থা অর্জনে।

এই অবস্থান ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভবিষ্যতে রাষ্ট্রসংঘ, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য বহুপাক্ষিক মঞ্চে Global South-এর দেশগুলির সমর্থন ভারতের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা

BRICS-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক আলোচনার বিষয় ছিল স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য এবং আন্তঃসীমান্ত অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা। ঘোষণাপত্রে সদস্য দেশগুলির মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বাড়ানোর প্রচেষ্টাকে সমর্থন করা হয়েছে এবং BRICS Payment Task Force বিভিন্ন পেমেন্ট ও মেসেজিং ব্যবস্থার মধ্যে সংযোগ তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে।

এর ফলে ভবিষ্যতে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের কিছু আন্তর্জাতিক লেনদেনে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে রাশিয়া, ইরান বা অন্যান্য BRICS দেশের সঙ্গে বাণিজ্যে বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থার গুরুত্ব বাড়তে পারে।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার — এই সম্মেলনে কোনও ‘BRICS মুদ্রা’ চালুর সিদ্ধান্ত হয়নি। অর্থাৎ ডলারের বিকল্প হিসেবে কোনও নতুন যৌথ মুদ্রা এখনই বাজারে আসছে না। বরং স্থানীয় মুদ্রা এবং পেমেন্ট ব্যবস্থার উন্নয়নই আপাতত বাস্তবসম্মত লক্ষ্য।

Critical minerals নিয়ে ভারতের অবস্থান

বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে lithium, cobalt, nickel, rare earth elements-এর মতো critical minerals অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, সেমিকন্ডাক্টর, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং নবীকরণযোগ্য শক্তির প্রযুক্তিতে এগুলির প্রয়োজন হয়।

এই কারণেই প্রধানমন্ত্রী মোদি প্রযুক্তি ও critical minerals-কে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

ভারতের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের EV, battery manufacturing, semiconductor এবং renewable energy শিল্প আগামী দিনে দ্রুত বাড়তে চলেছে। BRICS-এর মধ্যে সরবরাহ-শৃঙ্খল সহযোগিতা বাস্তবায়িত হলে ভারতীয় শিল্পের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

AI ও প্রযুক্তিতে নতুন সুযোগ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-ও এবারের BRICS আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সময়ে উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে AI সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

চীন BRICS-এর মধ্যে AI সহযোগিতা বাড়াতে ‘AI Open Source Zone’-এর মতো উদ্যোগের কথা সামনে এনেছে। ফলে প্রযুক্তি ক্ষেত্রে BRICS-এর মধ্যে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সহযোগিতার সম্ভাবনাও বাড়ছে।

ভারতের জন্য এর অর্থ হল — নিজস্ব AI ecosystem, startup এবং digital public infrastructure-কে BRICS-এর বড় বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ। তবে এই ক্ষেত্রে ভারতের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়, কারণ AI ক্ষেত্রে চীন ইতিমধ্যেই অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।

স্বাস্থ্য ও মহামারি মোকাবিলায় ভারতের উদ্যোগ

ভবিষ্যতে মহামারি বা সংক্রামক রোগ দ্রুত শনাক্ত করার জন্য BRICS Integrated Early Warning System তৈরির উদ্যোগের কথা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। পাশাপাশি স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি এবং জ্বালানি ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।

ভারতের জন্য এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কারণ দেশের জনসংখ্যা বিশাল এবং স্বাস্থ্য নিরাপত্তার সঙ্গে প্রযুক্তি ও দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানকে যুক্ত করা গেলে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যসংকট মোকাবিলায় সুবিধা হতে পারে।

ভারত-চীন সম্পর্কেও নতুন সুযোগ

BRICS সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমান্ত সমস্যা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু একই সঙ্গে ভারত ও চীন — দুই দেশই BRICS-এর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।

তাই অর্থনীতি, বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটিকে সীমান্ত সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখা যাবে না। ভারত-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখনও একাধিক জটিল প্রশ্নের সমাধান বাকি।

সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের অবস্থান

BRICS ঘোষণাপত্রে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অবস্থানও ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নয়াদিল্লি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সন্ত্রাসবাদকে কোনওভাবেই সমর্থন না করার বিষয়ে জোর দিয়ে এসেছে।

BRICS-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর ঘোষণায় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান ভারতের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করে। এর ফলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ভারতের বক্তব্যকে আরও বেশি সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তাহলে কি ভারত সরাসরি আর্থিক লাভ পেল?

এই প্রশ্নের উত্তর ‘না, সরাসরি নয়’। BRICS সম্মেলন থেকে ভারত কোনও বিশাল আর্থিক অনুদান, বিশেষ ঋণ বা তাৎক্ষণিক বিনিয়োগ প্যাকেজ পায়নি। তাই সম্মেলনকে শুধুমাত্র ‘কত টাকা এল’ দিয়ে বিচার করলে ভারতের অর্জনকে সঠিকভাবে বোঝা যাবে না।

ভারতের আসল অর্জন হল — কূটনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি, Global South-এর নেতৃত্বে নিজের অবস্থান শক্ত করা, BRICS-এর অর্থনৈতিক সহযোগিতায় ভবিষ্যতের সুযোগ তৈরি, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের সম্ভাবনা বাড়ানো, critical minerals ও supply chain সহযোগিতা এবং AI ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে নতুন অংশীদারিত্বের দরজা খোলা।

সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

তবে ঘোষণাপত্র গ্রহণ করাই শেষ কথা নয়। এখন আসল পরীক্ষা হবে — এই সিদ্ধান্তগুলি কতটা বাস্তবে কার্যকর হয়।

স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য কতটা বাড়ে, cross-border payment ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয়, critical minerals-এর সরবরাহ কতটা স্থিতিশীল হয়, AI সহযোগিতা বাস্তবে কতটা এগোয় এবং Global South-এর দেশগুলির জন্য BRICS কতটা বাস্তব সুবিধা তৈরি করতে পারে — এসবের ওপরই ভারতের BRICS সভাপতিত্বের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে।

ভারত এবার BRICS-এর সভাপতিত্ব চীনের হাতে তুলে দিয়েছে। ফলে নয়াদিল্লির তৈরি করা উদ্যোগগুলিকে আগামী বছরগুলিতে কতটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, নয়াদিল্লির BRICS সম্মেলন থেকে ভারতের সবচেয়ে বড় লাভ অর্থ নয়, বরং প্রভাব। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজের কূটনৈতিক গুরুত্ব বাড়ানো এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলির মধ্যে নেতৃত্বের জায়গা আরও মজবুত করাই ভারতের প্রধান অর্জন। এখন সেই কূটনৈতিক সাফল্যকে বাস্তব বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সুবিধায় পরিণত করাই হবে ভারতের পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -