হঠাৎ রক্তে শর্করা কমে গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। ৭০ mg/dL-এর নিচে নেমে গেলে সচেতন ব্যক্তি দ্রুত গ্লুকোজ, ফলের রস বা চিনি গ্রহণ করতে পারেন। ১৫ মিনিট পর সুগার পরীক্ষা করে প্রয়োজন হলে আবার শর্করা নিতে হবে। অজ্ঞান বা খিঁচুনি হলে মুখে খাবার-জল দেওয়া যাবে না; দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। বারবার এমন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি।

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য রক্তে শর্করা বা ব্লাড সুগার কমে যাওয়া একটি পরিচিত কিন্তু কখনও কখনও বিপজ্জনক সমস্যা। বিশেষ করে ইনসুলিন বা কিছু নির্দিষ্ট ডায়াবেটিসের ওষুধ ব্যবহারকারী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে হঠাৎ সুগার কমে গেলে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি গুরুতর হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে বলা হয় হাইপোগ্লাইসেমিয়া।
সাধারণভাবে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত অনেকের ক্ষেত্রে রক্তে গ্লুকোজ ৭০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটারের নিচে নেমে গেলে লো ব্লাড সুগার হিসেবে ধরা হয়। তবে ব্যক্তিভেদে চিকিৎসকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ভিন্ন হতে পারে।
কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে?
সুগার কমে গেলে অনেক সময় শরীর দ্রুত সতর্ক সংকেত দিতে শুরু করে। এর মধ্যে রয়েছে হাত-পা কাঁপা, অতিরিক্ত ঘাম, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, ক্ষুধা লাগা, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, অস্থিরতা, বিরক্তি কিংবা উদ্বেগ। রক্তে শর্করা আরও কমে গেলে বিভ্রান্তি, কথা জড়িয়ে যাওয়া, দৃষ্টির সমস্যা, খিঁচুনি এমনকি অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
প্রথমেই কী করতে হবে?
ব্যক্তি সচেতন থাকলে এবং গিলতে পারলে সম্ভব হলে দ্রুত ব্লাড সুগার পরীক্ষা করতে হবে। মাত্রা ৭০ mg/dL-এর নিচে থাকলে প্রচলিত ‘১৫-১৫ নিয়ম’ অনুসরণ করা যায়। অর্থাৎ প্রথমে প্রায় ১৫ গ্রাম দ্রুত কাজ করে এমন কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ করতে হবে। এরপর ১৫ মিনিট অপেক্ষা করে আবার রক্তে শর্করা পরীক্ষা করতে হবে। মাত্রা এখনও ৭০ mg/dL-এর নিচে থাকলে একই প্রক্রিয়া পুনরায় করতে হবে।
দ্রুত শর্করা হিসেবে গ্লুকোজ ট্যাবলেট, অর্ধেক কাপ ফলের রস বা সাধারণ কোমল পানীয়ের মতো খাবার ব্যবহার করা যেতে পারে। চিনি বা মধুও উপযুক্ত পরিমাণে ব্যবহার করা যায়। ডায়েট বা ‘শূন্য চিনি’ লেখা পানীয় এ ক্ষেত্রে দ্রুত শর্করা হিসেবে কার্যকর নয়।
সুগার স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসার পর পরবর্তী নিয়মিত খাবার খেতে দেরি থাকলে কার্বোহাইড্রেট ও প্রোটিনযুক্ত হালকা খাবার খাওয়া উপকারী হতে পারে।
অজ্ঞান হয়ে গেলে কী করবেন?
পরিস্থিতি গুরুতর হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল — অজ্ঞান বা খিঁচুনি হওয়া ব্যক্তির মুখে কোনো খাবার, জল, চিনি বা মিষ্টি জোর করে দেওয়া যাবে না। এতে খাবার বা তরল শ্বাসনালিতে ঢুকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
গুরুতর হাইপোগ্লাইসেমিয়ায় ব্যক্তি নিজে খাবার গ্রহণ করতে না পারলে গ্লুকাগন ব্যবহার করা যেতে পারে, যদি তা আগে থেকে চিকিৎসকের পরামর্শে রাখা থাকে এবং উপস্থিত কেউ সঠিকভাবে ব্যবহার করতে জানেন। এরপর দ্রুত জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নিতে হবে।
কেন হঠাৎ সুগার কমে যায়?
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ইনসুলিন বা নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ গ্রহণ, সময় মতো খাবার না খাওয়া, খাবার বাদ দেওয়া এবং স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি শারীরিক পরিশ্রম হাইপোগ্লাইসেমিয়ার কারণ হতে পারে। খালি পেটে অ্যালকোহল গ্রহণও রক্তে শর্করা বিপজ্জনকভাবে কমিয়ে দিতে পারে।
তাই ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ইনসুলিনের মাত্রা নিজের ইচ্ছায় পরিবর্তন না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বারবার সুগার কমে গেলে কখন, কতটা সুগার কমেছে, কী খাবার খেয়েছেন, কী ওষুধ নিয়েছেন এবং কী ধরনের শারীরিক পরিশ্রম করেছেন — এসব তথ্য লিখে রাখলে কারণ চিহ্নিত করতে চিকিৎসকের সুবিধা হয়।
সচেতনতাই পারে ঝুঁকি কমাতে
যারা ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ইনসুলিন ব্যবহার করেন, তাদের নিয়মিত নিজের রক্তে শর্করার মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা এবং লো সুগারের প্রাথমিক লক্ষণগুলো সম্পর্কে জানা গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে সঙ্গে দ্রুত গ্রহণযোগ্য শর্করা রাখাও কাজে আসতে পারে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি — বারবার হাইপোগ্লাইসেমিয়া হওয়া স্বাভাবিক ঘটনা নয়। এর পেছনে ওষুধের মাত্রা, খাবারের সময়সূচি, শারীরিক পরিশ্রমসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তাই পুনরাবৃত্তি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
অর্থাৎ হঠাৎ সুগার লো হলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি সচেতন থাকলে দ্রুত শর্করা দিয়ে ‘১৫-১৫ নিয়ম’ অনুসরণ করা যেতে পারে। আর ব্যক্তি অজ্ঞান হলে মুখে কিছু না দিয়ে জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নিতে হবে। গুরুতর বা বারবার হওয়া হাইপোগ্লাইসেমিয়াকে কখনও অবহেলা করা উচিত নয়।

