‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে ফের রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। কংগ্রেস ১৯৩৭ সালের সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরে দলীয় অনুষ্ঠানে গানটির প্রথম দুটি স্তবক গাওয়ার অবস্থানে অনড়। বিজেপি এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে জাতীয় গানের প্রতি অসম্মানের অভিযোগ তুলেছে। গানটির ঐতিহাসিক মর্যাদা, ধর্মীয় প্রতীক এবং জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নকে ঘিরে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। বর্তমানে বিষয়টি জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।

স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম ঐতিহাসিক গান ‘বন্দে মাতরম’কে ঘিরে ফের উত্তপ্ত ভারতের রাজনীতি। জাতীয় গানের কতগুলি স্তবক গাওয়া হবে, সরকারি অনুষ্ঠানে এর পরিবেশনের নিয়ম কী হবে এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে গানটির অবস্থান — এই একাধিক প্রশ্নকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক সংঘাত তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে কংগ্রেসের ১৯৩৭ সালের সিদ্ধান্তকে ঘিরে।
১৯ আগস্ট কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে দলটি স্পষ্ট করেছে, তাদের নিজস্ব কর্মসূচিতে ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম দুটি স্তবকই গাওয়া হবে। কংগ্রেসের বক্তব্য, এটি কোনও নতুন সিদ্ধান্ত নয়; ১৯৩৭ সালে তৎকালীন কংগ্রেসের নেওয়া অবস্থানই তারা অনুসরণ করছে।
অন্যদিকে বিজেপি এই অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেছে। বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নাবিন অভিযোগ করেছেন, কংগ্রেসের এই সিদ্ধান্ত জাতীয় গানের প্রতি অসম্মানের প্রতিফলন। তিনি কংগ্রেসকে ‘নতুন মুসলিম লীগ’ বলেও আক্রমণ করেছেন। তাঁর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও বেড়েছে।
বিতর্কের সূত্রপাত কোথায়?
বর্তমান বিতর্কের তাৎক্ষণিক সূত্রপাত স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানকে ঘিরে। ১৫ আগস্ট কংগ্রেসের দিল্লির সদর দফতরে ‘বন্দে মাতরম’-এর পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ পরিবেশন করা হয়। সেই অনুষ্ঠানের কিছু দৃশ্য নিয়ে বিজেপি অভিযোগ তোলে, কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব গানটির প্রতি যথাযথ সম্মান দেখায়নি। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
কংগ্রেস অবশ্য বিজেপির অভিযোগের পাল্টা জবাব দিয়েছে। দলটির সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে দাবি করেছেন, কংগ্রেস ঐতিহাসিকভাবে যে সংস্করণ গেয়ে এসেছে, সেটিই তারা অনুসরণ করছে। তিনি মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু ও সর্দার প্যাটেলের সময়কার চর্চার কথাও তুলে ধরে বিজেপির অভিযোগের জবাব দেন।
এর পরেই ১৯ আগস্টের কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসে। দলটি জানিয়ে দেয়, কংগ্রেসের নিজস্ব কর্মসূচিতে প্রথম দুটি স্তবক গাওয়ার ঐতিহাসিক অবস্থানই বজায় থাকবে।
কেন শুধু প্রথম দুটি স্তবক?
‘বন্দে মাতরম’-এর ইতিহাস এই বিতর্ক বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচিত এই গান স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় জাতীয়তাবাদী আবেগের অন্যতম শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯৬ সালে কংগ্রেসের অধিবেশনে গানটি পরিবেশন করেছিলেন। পরবর্তীকালে স্বদেশি আন্দোলনের সময় গানটি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ স্লোগান ও সংগীতে পরিণত হয়।
তবে গানটির পরবর্তী স্তবকগুলিতে হিন্দু ধর্মীয় প্রতীকের উল্লেখ থাকায় তা নিয়ে আপত্তিও তৈরি হয়েছিল। ১৯৩৭ সালে কংগ্রেসের আলোচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানে গানটির প্রথম দুটি স্তবক ব্যবহার করা হবে। এর পেছনে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অনুভূতিকে বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
প্রথম দুটি স্তবকে মূলত মাতৃভূমির প্রকৃতি, সৌন্দর্য, উর্বরতা ও মমতার প্রশংসা করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী অংশে দেবী দুর্গাসহ হিন্দু ধর্মীয় প্রতীকের উল্লেখ রয়েছে। সেই কারণেই জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে প্রথম দুটি স্তবককে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করা হয়েছিল।
‘বন্দে মাতরম’ কি জাতীয় সঙ্গীত?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ‘বন্দে মাতরম’ ভারতের জাতীয় গান (National Song), জাতীয় সঙ্গীত (National Anthem) নয়। ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হল ‘জন গণ মন’।
১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি গণপরিষদের শেষ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে ‘জন গণ মন’-কে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি ‘বন্দে মাতরম’-এর ঐতিহাসিক মর্যাদাকেও সমান সম্মান দেওয়ার কথা বলা হয়। ফলে দুটি গানের সাংবিধানিক ও ঐতিহাসিক অবস্থান নিয়ে আলাদা করে আলোচনা প্রয়োজন।
এই কারণেই বর্তমান রাজনৈতিক বিতর্কে ‘বন্দে মাতরম’কে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে উল্লেখ করা সঠিক নয়। বরং এটিকে জাতীয় গান হিসেবে উল্লেখ করাই যথাযথ।
বিজেপির আপত্তি কী?
বিজেপির বক্তব্য, ‘বন্দে মাতরম’ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও জাতীয় চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই গানটির পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ নিয়ে আপত্তি তোলা বা সীমিত সংস্করণ ব্যবহারের সিদ্ধান্তকে তারা রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বিজেপি সভাপতি নীতিন নাবিন কংগ্রেসের দুই স্তবক গাওয়ার সিদ্ধান্তকে তীব্র আক্রমণ করে দাবি করেছেন, এর মাধ্যমে কংগ্রেস জাতীয় আবেগের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখাচ্ছে না। তিনি কংগ্রেসের এই অবস্থানকে ঐতিহাসিক মুসলিম লীগের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
কংগ্রেসের পাল্টা যুক্তি
কংগ্রেসের বক্তব্য, গানটির প্রতি তাদের কোনও অসম্মান নেই। বরং ১৯৩৭ সালের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতাই তারা বজায় রাখছে। দলের মতে, স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় জাতীয় ঐক্য ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিয়েই প্রথম দুটি স্তবক বেছে নেওয়া হয়েছিল।
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বিজেপির সমালোচনার জবাবে স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় কংগ্রেসের ভূমিকা এবং গানটির ঐতিহাসিক ব্যবহারের প্রসঙ্গ সামনে এনেছেন। ফলে বিতর্কটি এখন শুধু গানটির পরিবেশন পদ্ধতি নিয়ে সীমাবদ্ধ নেই; স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস এবং জাতীয়তাবাদের ব্যাখ্যাও রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
এখন কি হতে পারে?
‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে বিতর্ক আপাতত থামার কোনও লক্ষণ নেই। একদিকে কেন্দ্রীয় স্তরে গানটির পূর্ণাঙ্গ পরিবেশন ও সরকারি অনুষ্ঠানের প্রোটোকল নিয়ে আলোচনা চলছে, অন্যদিকে কংগ্রেস তাদের ঐতিহাসিক দুই-স্তবকের অবস্থান বজায় রাখছে। ফলে আগামী দিনে বিষয়টি আরও রাজনৈতিক কর্মসূচি ও নির্বাচনী প্রচারের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল — ‘বন্দে মাতরম’ কেবল একটি গান নয়; এটি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন, জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় অনুভূতি এবং বহুত্ববাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি ঐতিহাসিক প্রতীক। তাই গানটির কোন অংশ গাওয়া হবে, সেই প্রশ্নের সঙ্গে ইতিহাস ও রাজনীতির বহুস্তরীয় বিতর্কও জড়িয়ে রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কংগ্রেস যেখানে ১৯৩৭ সালের সিদ্ধান্তকে নিজেদের অবস্থানের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরছে, সেখানে বিজেপি জাতীয় আবেগ ও পূর্ণাঙ্গ গান পরিবেশনের পক্ষে জোর দিচ্ছে। ফলে ‘বন্দে মাতরম’কে ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাত আগামী দিনেও ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

