চিলি ও পেরুর উপকূলের সামুদ্রিক পাখিরা খাদ্যের সন্ধানে অস্বাভাবিকভাবে পানামার দিকে চলে যাচ্ছে। শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় অ্যাঙ্কোভি ও সার্ডিনের মতো মাছের বিচরণক্ষেত্র বদলেছে। ফলে মাছনির্ভর পাখিরাও স্বাভাবিক আবাসস্থল ছেড়ে দূরে ছড়িয়ে পড়ছে। পানামা উপসাগরে ইনকা টার্ন, পেরুভিয়ান বুবি, গ্রে গাল ও ব্লু-ফুটেড বুবির মতো প্রজাতির উপস্থিতি গবেষকদের নজর কেড়েছে।

সাধারণত দক্ষিণ আমেরিকার পেরু ও চিলির উপকূলের ঠান্ডা, পুষ্টিসমৃদ্ধ প্রশান্ত মহাসাগরীয় জলেই দেখা যায় যে সামুদ্রিক পাখিদের, তাদেরই এখন অস্বাভাবিক সংখ্যায় দেখা যাচ্ছে মধ্য আমেরিকার দেশ পানামার উপকূলে। বিজ্ঞানীদের মতে, এর পেছনে রয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরের শক্তিশালী ‘এল নিনো’ পরিস্থিতি। সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় মাছের অবস্থান বদলে গেছে। আর খাদ্যের সন্ধানে পাখিরাও বাধ্য হচ্ছে স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্রের অনেক দূরে চলে যেতে।
পানামা উপসাগরে গত কয়েক মাসে সামুদ্রিক পাখির এমন উপস্থিতি পাখিপ্রেমী ও গবেষকদের নজর কেড়েছে। বিশেষ করে জুন ২০২৬ থেকে অস্বাভাবিক সংখ্যায় পাখি দেখা যাওয়ার খবর পাওয়া যায়। পর্যবেক্ষণে একেক সময়ে প্রায় ৬০ থেকে ৪০০টি পাখির উপস্থিতিও নথিভুক্ত হয়েছে। আগের এল নিনো পরিস্থিতির সময় যে সংখ্যার দেখা মিলেছিল, তার তুলনায় এবারের উপস্থিতি অনেক বেশি বলে গবেষকদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে রয়টার্স।
কেন পেরু ও চিলির পাখি পানামায়?
এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে সমুদ্রের খাদ্যশৃঙ্খলে। পেরু ও চিলির উপকূল বরাবর প্রবাহিত ঠান্ডা সমুদ্রস্রোত ওই অঞ্চলের জলকে পুষ্টিসমৃদ্ধ করে তোলে। এই পরিবেশে বিপুল পরিমাণ ছোট মাছ, বিশেষ করে অ্যাঙ্কোভি ও সার্ডিনের মতো মাছ পাওয়া যায়। সেই মাছের ওপর নির্ভর করেই বহু সামুদ্রিক পাখি বেঁচে থাকে।
কিন্তু এল নিনোর সময় প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যায়। উষ্ণ জলের কারণে সমুদ্রের ওপরের স্তর ও নিচের পুষ্টিসমৃদ্ধ ঠান্ডা জলের স্বাভাবিক মিশ্রণ ব্যাহত হয়। ফলে সামুদ্রিক উৎপাদনশীলতা কমতে পারে এবং মাছ তাদের পরিচিত বিচরণক্ষেত্র বদলে অন্যত্র চলে যেতে পারে।
পেরুর সরকারি আবহাওয়া ও সমুদ্রবিষয়ক সংস্থা ENFEN-ও জানিয়েছে, উষ্ণ সমুদ্র পরিস্থিতির কারণে পেরুর উপকূলের অ্যাঙ্কোভির অবস্থান ও বিস্তারে পরিবর্তন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফলে সমস্যা তৈরি হয় মাছনির্ভর সামুদ্রিক পাখিদের জন্য। পরিচিত এলাকায় পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে তারা নতুন খাদ্যভূমির সন্ধানে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে শুরু করে। সেই কারণেই পেরু ও চিলির উপকূলের সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি প্রজাতি এখন পানামা উপসাগরের কাছে দেখা যাচ্ছে।
কোন কোন পাখি দেখা যাচ্ছে?
পানামায় অস্বাভাবিকভাবে দেখা যাওয়া পাখিদের মধ্যে রয়েছে ইনকা টার্ন (Inca tern), পেরুভিয়ান বুবি (Peruvian booby), গ্রে গাল (Gray gull) এবং ব্লু-ফুটেড বুবি (Blue-footed booby)-সহ কয়েকটি সামুদ্রিক প্রজাতি।
এর মধ্যে ইনকা টার্ন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই পাখি সাধারণত পেরু ও চিলির ঠান্ডা উপকূলীয় জলসীমার সঙ্গে যুক্ত। ফলে পানামা উপসাগরে এদের উপস্থিতি গবেষকদের কাছে পরিবেশগত পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
ব্লু-ফুটেড বুবি অবশ্য একেবারে আগে কখনও পানামায় দেখা যায়নি — এমন নয়। তবে এবার তাদের সংখ্যা ও উপস্থিতির ব্যাপ্তি স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি। পানামা সিটির কাছাকাছি এমন পাখির ঝাঁক দেখা যাওয়ায় স্থানীয় পাখিপ্রেমীদের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
শুধু পাখির গল্প নয়, বদলে যাচ্ছে সমুদ্রের খাদ্যশৃঙ্খল
গবেষকদের কাছে এই ঘটনাটি শুধু বিরল পাখি দেখার সুযোগ নয়। এর মধ্যে রয়েছে সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত।
একটি সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে ছোট প্রাণী ও মাছ থেকে শুরু করে বড় মাছ, সামুদ্রিক পাখি এবং অন্যান্য শিকারি প্রাণী — সবাই একটি খাদ্যশৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত। খাদ্যশৃঙ্খলের নিচের স্তরে পরিবর্তন হলে তার প্রভাব দ্রুত উপরের স্তরেও পৌঁছে যায়।
এল নিনোর কারণে যদি অ্যাঙ্কোভি ও সার্ডিনের মতো ছোট মাছ তাদের স্বাভাবিক এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়, তাহলে সেই মাছের ওপর নির্ভরশীল পাখিদেরও অবস্থান বদলাতে হয়। ফলে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে হঠাৎ পাখির সংখ্যা কমে যেতে পারে, আবার অন্য অঞ্চলে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে।
পেরুর ENFEN জানিয়েছে, এল নিনো পরিস্থিতি ২০২৬ সালের শেষভাগ পর্যন্ত শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, Niño 3.4 অঞ্চলে নভেম্বর ও ডিসেম্বরের দিকে পরিস্থিতি খুব শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
পানামাতেও বদলাচ্ছে আবহাওয়া
এল নিনোর প্রভাব শুধু সমুদ্রের পাখি ও মাছের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পানামার আবহাওয়াতেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। দেশটির আবহাওয়া ও জলবিদ্যা সংস্থা জানিয়েছে, ২০২৬ সালের মে মাস থেকেই সেখানে এল নিনো পরিস্থিতির প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছিল এবং বছরের বাকি সময়েও এর প্রভাব থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
ফলে একই সময়ে এক অঞ্চলে সমুদ্র উষ্ণ হয়ে মাছের বিচরণ বদলে যাচ্ছে, অন্যদিকে বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার স্বাভাবিক ধরনেও পরিবর্তন আসছে। এই পরিবর্তনগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সামুদ্রিক ও স্থলজ — দুই ধরনের বাস্তুতন্ত্রেই চাপ তৈরি করতে পারে।
পাখিরা কি স্থায়ীভাবে পানামায় চলে যাচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনই নিশ্চিতভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। বর্তমান পরিস্থিতিকে স্থায়ী স্থানান্তরের চেয়ে খাদ্যের সন্ধানে সাময়িক বিস্তার বা বিচরণক্ষেত্রের পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সমুদ্রের তাপমাত্রা ও খাদ্যের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পাখিদের একটি অংশ আবার তাদের পরিচিত এলাকায় ফিরে যেতে পারে। তবে এল নিনো দীর্ঘস্থায়ী হলে তাদের বিচরণপথ ও খাদ্যাভ্যাসে আরও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ — এই পাখিদের সবাই একই কারণে পানামায় এসেছে, এমনটাও বলা ঠিক নয়। বিভিন্ন প্রজাতির পরিবেশগত চাহিদা আলাদা। তবে একই সময়ে একাধিক দক্ষিণ আমেরিকান সামুদ্রিক পাখির স্বাভাবিক এলাকার বাইরে এত বেশি সংখ্যায় দেখা যাওয়া বিজ্ঞানীদের কাছে নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা?
এল নিনো নিজেই একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। তাই শুধুমাত্র পাখিদের এই অস্বাভাবিক উপস্থিতিকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলা যাবে না। তবে উষ্ণ সমুদ্র ও চরম আবহাওয়ার মতো পরিস্থিতি ভবিষ্যতে কতটা ঘন ঘন বা তীব্র হবে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
বর্তমান ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, সমুদ্রের তাপমাত্রায় পরিবর্তন হলে তার প্রভাব কত দ্রুত জীবজগতের ওপর পড়ে। মাছের অবস্থান বদলাচ্ছে, সেই সঙ্গে মাছনির্ভর পাখিরাও নিজেদের স্বাভাবিক এলাকার বাইরে চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ সমুদ্রের একটি পরিবর্তন পুরো খাদ্যশৃঙ্খলকে প্রভাবিত করতে পারে।
সামনে কী হতে পারে?
২০২৬ সালের শেষভাগে এল নিনোর পরিস্থিতি আরও শক্তিশালী হতে পারে বলে বিভিন্ন পূর্বাভাসে ইঙ্গিত রয়েছে। ফলে আগামী মাসগুলোতে পানামা উপসাগরে দক্ষিণ আমেরিকার সামুদ্রিক পাখির উপস্থিতি আরও বাড়ে কি না, তা বিজ্ঞানীরা নজরে রাখছেন।
এই পাখিদের গতিবিধি তাই শুধু পাখিপ্রেমীদের জন্য আকর্ষণীয় বিষয় নয়। সমুদ্রের তাপমাত্রা, মাছের বিস্তার এবং সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।
সব মিলিয়ে, পেরু ও চিলির উপকূল থেকে পানামার দিকে সামুদ্রিক পাখিদের এই অস্বাভাবিক উপস্থিতি প্রকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। সমুদ্রের উষ্ণতা বাড়লে তার প্রভাব কেবল জলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না — তার ঢেউ পৌঁছে যায় মাছের কাছে, মাছ থেকে পাখির কাছে, আর শেষ পর্যন্ত গোটা বাস্তুতন্ত্রে। পানামার আকাশে দেখা এই অচেনা অতিথিরাই হয়তো সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান সংকেত।

