NASA-এর Curiosity rover ২০২৬ সালে মঙ্গলে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আবিষ্কার করেছে। একটি প্রাচীন পাথরের নমুনায় সাতটি নতুন জৈব অণুর সন্ধান মিলেছে। পাশাপাশি প্রাচীন জলীয় পরিবেশ, জটিল কার্বনভিত্তিক যৌগ এবং শক্তিশালী বালুঝড়ের সম্ভাব্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব আবিষ্কার মঙ্গলের অতীত পরিবেশ ও সম্ভাব্য জীবনের অনুসন্ধানকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুললেও এখনও প্রাণের সরাসরি প্রমাণ মেলেনি।

মঙ্গল গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কি না, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে NASA-এর Curiosity rover। ২০১২ সালে মঙ্গলের Gale Crater-এ অবতরণের পর থেকে রোবটটি লাল গ্রহের মাটি, পাথর ও বায়ুমণ্ডল নিয়ে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে চলেছে। ২০২৬ সালেও সেই গবেষণায় এসেছে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। বিশেষ করে মঙ্গলের পাথরে আগে কখনও শনাক্ত না হওয়া একাধিক জৈব অণুর সন্ধান বিজ্ঞানীদের নতুন করে আগ্রহী করে তুলেছে।
মঙ্গলে প্রথমবার শনাক্ত সাত জৈব অণু
চলতি বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খবর আসে এপ্রিল মাসে। NASA জানায়, Curiosity rover-এর ২০২০ সালে সংগ্রহ করা একটি পাথরের নমুনা নতুন পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করে মোট ২১টি কার্বনযুক্ত অণুর সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সাতটি অণু মঙ্গলে এর আগে কখনও শনাক্ত হয়নি। বিজ্ঞানীদের মতে, এটিই এখন পর্যন্ত মঙ্গলের কোনও নমুনায় পাওয়া সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় জৈব অণুর সংগ্রহ।
এই গবেষণায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছে Curiosity-এর Sample Analysis at Mars বা SAM নামের রাসায়নিক বিশ্লেষণাগার। মঙ্গলের পাথর থেকে সংগ্রহ করা নমুনাকে রাসায়নিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করে এর ভেতরে থাকা জৈব পদার্থ শনাক্ত করা হয়। গবেষণাটিতে প্রথমবারের মতো মঙ্গলে SAM-এর সঙ্গে tetramethylammonium hydroxide বা TMAH ব্যবহার করে এমন একটি রাসায়নিক পরীক্ষা করা হয়, যা নমুনার জৈব অণুগুলোকে আরও ভালোভাবে শনাক্ত করতে সাহায্য করেছে।
কোন ধরনের অণু পাওয়া গেছে?
গবেষণায় শনাক্ত হওয়া অণুগুলোর মধ্যে কিছু এমন রাসায়নিক উপাদান রয়েছে, যেগুলো পৃথিবীতে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ জৈব রসায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি অণু DNA ও RNA-এর মতো জৈব অণু তৈরির রাসায়নিক পূর্বসূরির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেছেন। তবে এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ — এই অণুগুলো পাওয়া গেলেও মঙ্গলে অতীতে প্রাণের অস্তিত্ব ছিল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।
জৈব বা organic molecule বলতে সাধারণভাবে কার্বনযুক্ত অণুকে বোঝানো হয়। পৃথিবীতে জীবনের সঙ্গে এই ধরনের অণুর গভীর সম্পর্ক থাকলেও এগুলো যে শুধুমাত্র জীব থেকেই তৈরি হবে, এমন নয়। ভূ-রাসায়নিক প্রক্রিয়া, আগ্নেয় বা অন্যান্য প্রাকৃতিক রাসায়নিক বিক্রিয়া এবং মহাকাশ থেকে আসা উল্কাপিণ্ডের মাধ্যমেও জৈব যৌগ তৈরি হতে পারে। তাই Curiosity-এর আবিষ্কারকে বিজ্ঞানীরা আপাতত জীবনের সম্ভাব্য রাসায়নিক উপাদানের সন্ধান হিসেবে দেখছেন, প্রাণের প্রত্যক্ষ প্রমাণ হিসেবে নয়।
মঙ্গলের প্রাচীন পরিবেশের রহস্য আরও গভীর
Curiosity-এর সাম্প্রতিক গবেষণার গুরুত্ব শুধু নতুন অণু আবিষ্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই নমুনাগুলো যে ভূতাত্ত্বিক পরিবেশ থেকে এসেছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। Gale Crater-এর পাথরগুলো একসময় প্রাচীন হ্রদ ও জলীয় পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত ছিল। বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন বছর আগে মঙ্গলের এই অঞ্চল তুলনামূলকভাবে উষ্ণ ও আর্দ্র ছিল।
এই প্রাচীন পরিবেশে জল, খনিজ এবং কার্বনযুক্ত রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতি মঙ্গল একসময় অণুজীবের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছিল কি না, সেই প্রশ্নের গবেষণাকে আরও জোরালো করছে। তবে বাসযোগ্য পরিবেশ থাকা এবং সেখানে সত্যিই প্রাণের অস্তিত্ব থাকা — দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
২০২৫ সালের আবিষ্কারেরও নতুন ব্যাখ্যা
২০২৬ সালের গবেষণাকে বুঝতে হলে Curiosity-এর ২০২৫ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের কথাও মনে রাখতে হয়। গত বছর rover-এর বিশ্লেষণে মঙ্গলে decane, undecane ও dodecane নামের দীর্ঘ-শৃঙ্খলযুক্ত হাইড্রোকার্বন শনাক্ত হয়েছিল। এগুলোকে তখন পর্যন্ত মঙ্গলে পাওয়া সবচেয়ে বড় জৈব অণু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেছিলেন, এগুলো প্রাচীন মাটিতে সংরক্ষিত fatty acid-এর ভাঙা অংশ হতে পারে।
২০২৬ সালের নতুন গবেষণা সেই ধারাবাহিকতাকে আরও এগিয়ে নিয়ে গেছে। অর্থাৎ মঙ্গলের প্রাচীন পাথরে শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু জৈব যৌগ নয়, বরং তুলনামূলকভাবে বৈচিত্র্যময় organic chemistry দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষিত থাকতে পারে — এমন সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে।
প্রাচীন বালুঝড়ের প্রমাণ
চলতি বছরে Curiosity-এর গবেষণায় মঙ্গলের অতীতের আবহাওয়া সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। “Jawbone Canyon” নামে পরিচিত একটি এলাকায় rover এমন পাথুরে স্তর শনাক্ত করেছে, যেগুলোকে বিজ্ঞানীরা প্রাচীন শক্তিশালী বায়ুপ্রবাহ বা বালুঝড়ের সম্ভাব্য প্রমাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।
NASA-এর Jet Propulsion Laboratory জানিয়েছে, সেখানে পাওয়া climbing wind-ripple strata মঙ্গলের অতীতের বায়ুমণ্ডল ও বাতাসের গতিবিধি সম্পর্কে বিরল তথ্য দিতে পারে। গবেষকদের মতে, এটি মঙ্গলে এই ধরনের ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের প্রথম প্রমাণ হতে পারে। গবেষণাটি ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ‘Geology’ জার্নালের প্রচ্ছদে স্থান পেয়েছে।
প্রাণের সন্ধানে কতটা এগোল Curiosity?
সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রশ্ন — তাহলে কি মঙ্গলে প্রাণ ছিল? এর উত্তর এখনও না। Curiosity এখনও পর্যন্ত এমন কোনও সরাসরি প্রমাণ পায়নি, যা নিশ্চিতভাবে মঙ্গলে অতীত বা বর্তমান জীবনের অস্তিত্ব প্রমাণ করে। বরং rover-এর আবিষ্কারগুলো দেখাচ্ছে যে প্রাচীন মঙ্গলে জলীয় পরিবেশ ছিল এবং সেখানে এমন জটিল কার্বনভিত্তিক রাসায়নিক উপাদানও ছিল, যা জীবনের উৎপত্তির জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।
বিজ্ঞানীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল — মঙ্গলের পাথর কয়েক বিলিয়ন বছর ধরে প্রাচীন রাসায়নিক চিহ্ন সংরক্ষণ করে রেখেছে। পৃথিবীতে দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক সময়ের কারণে একই বয়সের বহু পাথর ও প্রমাণ নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে মঙ্গল সৌরজগতের প্রাচীন পরিবেশ এবং জীবনের সম্ভাব্য উৎপত্তি বোঝার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক গবেষণাগার হয়ে উঠেছে।
Curiosity এখনও Gale Crater ও Mount Sharp অঞ্চলে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও পাথরের নমুনা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানতে চান, নতুন আবিষ্কৃত জৈব অণুগুলো কীভাবে তৈরি হয়েছিল এবং মঙ্গলের পরিবেশে সেগুলো এত দীর্ঘ সময় কীভাবে সংরক্ষিত রইল।
অতএব, ২০২৬ সালে Curiosity-এর আবিষ্কার মঙ্গলে প্রাণের সন্ধানকে এখনও চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়নি। কিন্তু নতুন জৈব অণু, প্রাচীন জলীয় পরিবেশ এবং মঙ্গলের অতীতের আবহাওয়ার নতুন প্রমাণ—সব মিলিয়ে লাল গ্রহের ইতিহাস আরও রহস্যময় এবং বৈজ্ঞানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই এখনও অমীমাংসিত, মঙ্গলে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান ছিল — কিন্তু সেই উপাদান থেকেই কি কখনও জীবনের জন্ম হয়েছিল?

