ইউরোপে এখনও জ্বলছে দাবানল, স্পেন-ফ্রান্সে নতুন করে উদ্বেগ

- Advertisement -

ইউরোপে ২০২৬ সালের ভয়াবহ দাবানল পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। স্পেন, ফ্রান্স, গ্রিস ও ইতালির বিভিন্ন অঞ্চলে আগুনের ঝুঁকি অব্যাহত রয়েছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা, দীর্ঘস্থায়ী খরা, শুষ্ক মাটি ও প্রবল বাতাস আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পরিবেশ তৈরি করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে এ বছর ইতিমধ্যে পাঁচ লাখ হেক্টরের বেশি এলাকা পুড়ে গেছে। আগামী দিনগুলোতে আবহাওয়াই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় নিয়ামক হবে।

ইউরোপে এখনও জ্বলছে দাবানল, স্পেন-ফ্রান্সে নতুন করে উদ্বেগ

ইউরোপে ভয়াবহ দাবানলের মৌসুম এখনও শেষ হয়নি। দক্ষিণ ইউরোপের স্পেন, গ্রিস ও ইতালির পাশাপাশি ফ্রান্সের কিছু এলাকাতেও আগুনের ঝুঁকি অব্যাহত রয়েছে। কোথাও বড় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও নতুন করে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা পরিস্থিতিকে অনিশ্চিত করে তুলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, শুষ্ক মাটি, কম বৃষ্টিপাত এবং প্রবল বাতাস — এই কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করায় চলতি গ্রীষ্মে ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দাবানলের ঝুঁকি বেড়েছে।

ইউরোপীয় কমিশনের Joint Research Centre (JRC)-এর সর্বশেষ ১১ আগস্টের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরু থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে ৫ লাখ ৫২ হাজার ৪৩৭ হেক্টর জমি দাবানলে পুড়ে গেছে। একই সময়ে ৩০ হেক্টরের বেশি আয়তনের ১,৬১৪টি আগুন শনাক্ত হয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় পোড়া জমির পরিমাণ কিছুটা কম হলেও চলতি মৌসুমের অগ্নিঝুঁকি এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

স্পেনে এখনও আগুনের আশঙ্কা

দাবানলের কারণে স্পেন সবচেয়ে বেশি নজরে রয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বড় আকারের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে একাধিক এলাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বিপুল সংখ্যক দমকলকর্মী, বিমান ও অন্যান্য জরুরি পরিষেবা মোতায়েন করা হয়।

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, স্পেনের কয়েকটি এলাকায় আগুনের পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও সব জায়গায় বিপদ কেটে যায়নি। ১১ আগস্টও দেশটির হুয়েলভা প্রদেশের ফগ এলাকার আগুনকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্নিকাণ্ডগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

তীব্র গরম ও শুষ্ক উদ্ভিদ আগুনকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করছে। এর ফলে একটি আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পরও অন্য কোনো এলাকায় নতুন করে আগুন লাগার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।

এর আগে স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলে বড় একটি দাবানলে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। প্রবল বাতাসের কারণে সেখানে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজও কঠিন হয়ে পড়ে এবং শত শত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

ফ্রান্সে নতুন করে আগুন, সরানো হল প্রায় ১,২০০ মানুষ

ফ্রান্সে জুলাইয়ের ভয়াবহ দাবানলের পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বড় একটি আগুন নিয়ন্ত্রণে এনে প্রায় দুই লাখ মানুষকে নিজ নিজ এলাকায় ফেরার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তবে অগ্নিঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয়নি।

সর্বশেষ প্রতিবেদনে উত্তর ফ্রান্সের উপকূলীয় এলাকায় দুটি দাবানলের কারণে একটি ক্যাম্পসাইট থেকে প্রায় ১,২০০ মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার কথা জানা গেছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগুন দুটি সমুদ্রসৈকতের কাছাকাছি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

এ ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, শুধু দক্ষিণ ফ্রান্স নয়, দেশের অন্য অংশেও শুষ্ক আবহাওয়া ও উচ্চ তাপমাত্রার কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

গ্রিসেও সতর্কতা অব্যাহত

আগস্টের শুরুতে গ্রিসের বিভিন্ন এলাকায় দাবানল ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রবল বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় বেশ কিছু এলাকায় মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছিল। আগুন মোকাবিলায় বিমান ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়।

গ্রিসে দাবানল মোকাবিলার সময় একটি অগ্নিনির্বাপণ হেলিকপ্টার দুর্ঘটনারও খবর পাওয়া যায়। দেশটির জন্য দাবানল শুধু পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, অর্থনীতির জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। পর্যটননির্ভর অঞ্চলগুলোতে আগুন ও ধোঁয়ার প্রভাব পড়লে পর্যটকদের চলাচল, স্থানীয় ব্যবসা এবং অবকাঠামোর ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

ইতালি ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলেও অগ্নিঝুঁকি

ইউরোপের দাবানল পরিস্থিতি শুধু স্পেন, ফ্রান্স বা গ্রিসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন অংশে উচ্চ তাপমাত্রা ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে আগুন ছড়িয়ে পড়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

ইউরোপীয় Forest Fire Information System বা EFFIS-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান মৌসুমে ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের অগ্নিকাণ্ডের পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, মাটির আর্দ্রতা এবং বাতাসের মতো বিভিন্ন সূচকের ওপর ভিত্তি করে আগুনের ঝুঁকি নির্ধারণ করা হয়।

কেন বারবার ভয়াবহ হচ্ছে দাবানল?

দাবানলের পেছনে একাধিক প্রাকৃতিক ও মানবিক কারণ থাকতে পারে। তবে আবহাওয়ার পরিস্থিতি আগুনের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হলে মাটি ও গাছপালা শুকিয়ে যায়। তখন সামান্য আগুনও দ্রুত বড় এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।

চলতি গ্রীষ্মে পশ্চিম ইউরোপের কিছু অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং তীব্র তাপপ্রবাহের পর দাবানল পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। একটি সাম্প্রতিক গবেষণা বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ফ্রান্স ও স্পেনে দীর্ঘ খরা, চরম তাপ এবং শুষ্ক পরিবেশ একসঙ্গে কাজ করে গুরুতর দাবানল পরিস্থিতি তৈরির সম্ভাবনা বাড়িয়েছে।

এদিকে দাবানলের ধোঁয়া শুধু আগুনের কাছাকাছি এলাকার মানুষের জন্য সমস্যা তৈরি করে না। বাতাসের গতিপথের ওপর নির্ভর করে ধোঁয়ার কণা বহু দূরের এলাকাতেও পৌঁছে যেতে পারে। ইউরোপের সাম্প্রতিক দাবানলের ধোঁয়া নিয়ে Copernicus Atmosphere Monitoring Service-ও বায়ুদূষণের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ করেছে।

সামনে কী?

আগামী দিনগুলোতে ইউরোপের দাবানল পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে তাপমাত্রা, বাতাস এবং বৃষ্টিপাতের ওপর। কোনো এলাকায় তাপমাত্রা কমে বৃষ্টি হলে আগুন নিয়ন্ত্রণ সহজ হতে পারে। কিন্তু শুষ্ক আবহাওয়া ও প্রবল বাতাস ফিরে এলে নিয়ন্ত্রণে থাকা আগুনও আবার সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের পোড়া এলাকার পরিমাণ এখনও ২০২৫ সালের রেকর্ড মাত্রার নিচে রয়েছে। কিন্তু আগস্টের মাঝামাঝি সময়েও নতুন নতুন অগ্নিকাণ্ড এবং উচ্চ অগ্নিঝুঁকি থাকায় পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক বলার সুযোগ নেই।

সব মিলিয়ে, ইউরোপের দাবানল এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। স্পেন ও গ্রিসের মতো দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলোর পাশাপাশি ফ্রান্সের কিছু এলাকাতেও নতুন করে আগুনের ঘটনা পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে। আবহাওয়া অনুকূলে না এলে আগস্টের বাকি সময়েও ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে দাবানল বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতে পারে।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -