অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চ-রোগক্ষম H5N1 বার্ড ফ্লু বন্য পাখিদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়াসহ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে সংক্রমণ ও সমুদ্রপাখির গণমৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বাণিজ্যিক পোলট্রি খামারে ভাইরাস শনাক্ত হয়নি। সরকার কঠোর নজরদারি ও বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থা জোরদার করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ মানুষের জন্য সংক্রমণের ঝুঁকি বর্তমানে খুবই কম।

অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চ-রোগক্ষম H5N1 বার্ড ফ্লুর বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বন্য পাখির মধ্যে ভাইরাসটির সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর পরিস্থিতিকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে সরকার। সম্প্রতি দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় সমুদ্রপাখির গণমৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত হওয়ার পর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি দেশটির বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
অস্ট্রেলিয়ার কৃষি, মৎস্য ও বন বিভাগ জানিয়েছে, ৬ আগস্ট পর্যন্ত দেশজুড়ে বন্য পাখির মধ্যে H5 বার্ড ফ্লুর ১২৩টি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া। এছাড়া ভিক্টোরিয়া, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া, নিউ সাউথ ওয়েলস এবং কুইন্সল্যান্ডেও সংক্রমণের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত বাণিজ্যিক মুরগির খামার বা কৃষি শিল্পে এই ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, পরিযায়ী বন্য পাখির মাধ্যমে ভাইরাসটি অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশ করেছে। এরপর এটি স্থানীয় বন্য পাখিদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের সমুদ্রপাখিগুলো বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
সমুদ্রপাখির গণমৃত্যু উদ্বেগ বাড়িয়েছে
দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার কেপ জাফা উপকূলের কাছাকাছি একটি দ্বীপে ‘গ্রেটার ক্রেস্টেড টার্ন’ প্রজাতির অসংখ্য পাখি অসুস্থ ও মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরীক্ষাগারে নমুনা বিশ্লেষণের পর নিশ্চিত হওয়া যায় যে এসব পাখি H5N1 ভাইরাসে আক্রান্ত ছিল।
এ ঘটনাকে অস্ট্রেলিয়ায় বন্যপ্রাণীর মধ্যে H5N1-এর প্রথম নিশ্চিত গণমৃত্যুর ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। হেলিকপ্টার জরিপ, মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষাগারের তথ্য বিশ্লেষণ করে কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ভাইরাসটি যদি আরও বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে বহু দেশীয় পাখির প্রজাতি হুমকির মুখে পড়তে পারে।
কেন H5N1 এত উদ্বেগের?
H5N1 হল উচ্চ-রোগক্ষম অ্যাভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার একটি ধরন, যা পাখিদের মধ্যে দ্রুত ছড়ায় এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রাণহানির কারণ হয়। গত কয়েক বছরে ইউরোপ, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা এবং এশিয়ার বহু দেশে এই ভাইরাসের কারণে কোটি কোটি বন্য ও খামারের পাখি মারা গেছে।
শুধু পাখিই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে শিয়াল, সিল, ডলফিন, বিড়াল, এমনকি কিছু গবাদিপশুর মধ্যেও H5N1 শনাক্ত হয়েছে। যদিও মানুষের মধ্যে সংক্রমণের ঘটনা খুবই সীমিত এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আক্রান্ত পাখির সরাসরি সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের মধ্যেই তা দেখা গেছে।
পোলট্রি শিল্পে এখনও স্বস্তি
অস্ট্রেলিয়ার জন্য সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হল, এখনও পর্যন্ত কোনও বাণিজ্যিক পোলট্রি খামারে H5N1 শনাক্ত হয়নি। দেশটির বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম কঠোর হওয়ায় সরকার শুরু থেকেই ব্যাপক সতর্কতা অবলম্বন করেছে।
খামারগুলোতে বাইরের পাখির প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, কর্মীদের স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা, যানবাহন ও সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত রাখা এবং সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ফলে আপাতত ডিম ও মুরগির উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়েনি।
সরকারের প্রস্তুতি
অস্ট্রেলিয়ার কৃষিমন্ত্রী জুলি কলিন্স বলেছেন, বন্যপ্রাণীর মধ্যে ভাইরাসটির বিস্তার আরও বাড়তে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিয়েই সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। সরকার ইতোমধ্যে —
- সংক্রমণ পর্যবেক্ষণ জোরদার করেছে,
- পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে,
- জরুরি প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা সক্রিয় করেছে,
- বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়েছে,
- এবং সাধারণ মানুষের জন্য সতর্কতা জারি করেছে।
স্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যপ্রাণীর ক্ষেত্রে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করা খামারের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন। কারণ পরিযায়ী পাখি শত শত কিলোমিটার ভ্রমণ করতে পারে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন এলাকায় ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারে।
সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকি কতটা?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ মানুষের জন্য H5N1-এর ঝুঁকি বর্তমানে খুবই কম। আক্রান্ত বা মৃত পাখির সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শে না এলে সংক্রমণের সম্ভাবনা অত্যন্ত কম থাকে। তবে কর্তৃপক্ষ সবাইকে কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছে —
- অসুস্থ বা মৃত বন্য পাখি স্পর্শ করবেন না।
- এমন ঘটনা দেখলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানান।
- পোষা পাখি থাকলে বাইরে ছেড়ে না দিয়ে নিরাপদ স্থানে রাখুন।
- খামারে কাজ করলে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করুন।
- মুরগির মাংস ও ডিম ভালোভাবে রান্না করে খেলে কোনো সমস্যা হয় না।
পরিবেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ
পরিবেশবিদরা বলছেন, এই ভাইরাস শুধু প্রাণিসম্পদের জন্য নয়, অস্ট্রেলিয়ার জীববৈচিত্র্যের জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে সমুদ্রপাখি, বিরল উপকূলীয় প্রজাতি এবং ছোট দ্বীপে বসবাসকারী পাখিরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
যদি ভাইরাসটি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বন্যপ্রাণীর মধ্যে সক্রিয় থাকে, তাহলে কিছু প্রজাতির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। এজন্য সংরক্ষণবাদীরা বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণ, আবাসস্থল রক্ষা এবং গবেষণায় আরও বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন।
সামনে কী হতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক মাস অস্ট্রেলিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিযায়ী পাখির চলাচল অব্যাহত থাকায় নতুন এলাকায় সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। যদিও বর্তমান পরিস্থিতি পোলট্রি শিল্পে প্রভাব ফেলেনি, তবুও সতর্কতা শিথিল করার সুযোগ নেই।
সরকার, বিজ্ঞানী এবং প্রাণিসম্পদ খাতের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দ্রুত সংক্রমণ শনাক্ত করা, আক্রান্ত এলাকা পর্যবেক্ষণ করা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। তবে অসুস্থ বা মৃত পাখির সংস্পর্শ এড়ানো, সরকারি নির্দেশনা মেনে চলা এবং সন্দেহজনক ঘটনা দ্রুত জানানোই H5N1 বার্ড ফ্লুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে।

