রামের একমাত্র বোন হিসেবে শান্তার নাম বহু পুরাণ, আঞ্চলিক রামায়ণ ও লোকঐতিহ্যে উল্লেখ রয়েছে। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, তিনি রাজা দশরথ ও রানি কৌশল্যার কন্যা এবং পরে অঙ্গরাজ রোমপাদের কাছে দত্তক যান। ঋষ্যশৃঙ্গের সঙ্গে তাঁর বিবাহ ও পুত্রকামেষ্টি যজ্ঞের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তাঁকে রামায়ণের এক গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত চরিত্রে পরিণত করেছে।

ভগবান রামের জীবন ও আদর্শ নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে হাজার বছর ধরে অসংখ্য গ্রন্থ, কাব্য ও গবেষণা রচিত হয়েছে। রাম, সীতা, লক্ষ্মণ, ভরত ও শত্রুঘ্নের নাম প্রায় সবারই পরিচিত। তবে অনেকেই জানেন না, বিভিন্ন পুরাণ, আঞ্চলিক রামায়ণ এবং লোকপ্রচলিত ঐতিহ্য অনুযায়ী রামের একজন বোনেরও উল্লেখ রয়েছে। তাঁর নাম শান্তা।
যদিও এই তথ্যটি সর্বত্র সমানভাবে প্রচলিত নয়, তবুও ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে শান্তার কাহিনি বহু শতাব্দী ধরে আলোচিত হয়ে আসছে।
শান্তা কে ছিলেন?
প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, শান্তা ছিলেন অযোধ্যার রাজা দশরথ ও রানি কৌশল্যার কন্যা। অর্থাৎ তিনি রাম, ভরত, লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্নের জ্যেষ্ঠ ভগিনী।
কিছু প্রাচীন গ্রন্থ ও লোকবিশ্বাসে বলা হয়, অঙ্গদেশের রাজা রোমপাদ ছিলেন দশরথের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাঁর কোনো সন্তান না থাকায় দশরথ শান্তাকে রোমপাদের কাছে দত্তক দেন। এরপর শান্তা অঙ্গরাজ্যের রাজকন্যা হিসেবে বড় হন।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শান্তার জীবনের সঙ্গে অযোধ্যা ও অঙ্গরাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক-ধর্মীয় সম্পর্কের কথাও বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঋষ্যশৃঙ্গের সঙ্গে বিবাহ
ধর্মীয় কাহিনি অনুযায়ী, শান্তার বিবাহ হয় ঋষি ঋষ্যশৃঙ্গের সঙ্গে। ঋষ্যশৃঙ্গ ছিলেন তপস্যা, জ্ঞান ও যজ্ঞবিদ্যায় পারদর্শী এক বিশিষ্ট ঋষি।
অনেক পুরাণ ও আঞ্চলিক রামায়ণে বলা হয়েছে, পরে রাজা দশরথ যখন উত্তরাধিকারী সন্তানের অভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন, তখন ঋষ্যশৃঙ্গকে অযোধ্যায় আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাঁর পরিচালিত পুত্রকামেষ্টি যজ্ঞের ফলেই দশরথের চার পুত্র — রাম, ভরত, লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্ন — জন্মগ্রহণ করেন বলে ঐতিহ্যে বর্ণিত রয়েছে।
এই কারণে শান্তাকে অনেক গবেষক রামজন্মের পূর্বকাহিনির একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করেন।
কেন শান্তার নাম কম পরিচিত?
রামায়ণের মূল কাহিনিতে যুদ্ধ, বনবাস, অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন এবং রামরাজ্যের বিবরণই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে শান্তার চরিত্র সাধারণ মানুষের আলোচনায় খুব বেশি স্থান পায়নি।
এছাড়া সংস্কৃত বাল্মীকি রামায়ণে শান্তার উপস্থিতি অত্যন্ত সীমিত বা অনুপস্থিত বলে অনেক গবেষক মত প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে পদ্ম পুরাণ, ভাগবত পুরাণের কিছু ব্যাখ্যা, আঞ্চলিক রামায়ণ এবং লোকঐতিহ্যে তাঁর পরিচয় আরও বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে।
ফলে বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থ ও ঐতিহ্যের মধ্যে শান্তাকে নিয়ে বর্ণনাগত পার্থক্য দেখা যায়।
ইতিহাস নাকি ধর্মীয় ঐতিহ্য?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শান্তার কাহিনিকে মূলত ধর্মীয় ঐতিহ্য, পুরাণভিত্তিক বর্ণনা এবং আঞ্চলিক লোকবিশ্বাসের অংশ হিসেবে দেখা উচিত। কারণ প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের বিভিন্ন সংস্করণে একই ঘটনার একাধিক বিবরণ পাওয়া যায়।
এই কারণেই কোনো একটি সূত্রের তথ্যকে একমাত্র ও চূড়ান্ত ইতিহাস হিসেবে না দেখে, বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থ ও ঐতিহ্যের আলোকে বিষয়টি মূল্যায়ন করার পরামর্শ দেন গবেষকেরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন আগ্রহ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব এবং ধর্মীয় আলোচনা কেন্দ্রিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শান্তার নাম নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করে জানতে চান, রামের একজন বোনের কথা কেন এতদিন সাধারণভাবে প্রচারিত হয়নি।
ধর্মীয় গবেষকরা বলছেন, ডিজিটাল যুগে প্রাচীন গ্রন্থ ও আঞ্চলিক সাহিত্য সহজলভ্য হওয়ায় এমন বহু কম পরিচিত তথ্য এখন নতুন প্রজন্মের সামনে উঠে আসছে।
রামের একমাত্র বোন হিসেবে শান্তার পরিচয় বহু ধর্মীয় ঐতিহ্যে স্বীকৃত হলেও, এটি সব রামায়ণের অভিন্ন বা সর্বজনস্বীকৃত বিবরণ নয়। তবুও শান্তার জীবন, তাঁর দত্তক গ্রহণ, ঋষ্যশৃঙ্গের সঙ্গে বিবাহ এবং পুত্রকামেষ্টি যজ্ঞের সঙ্গে তাঁর পরোক্ষ সম্পর্ক ভারতীয় ধর্মীয় সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য ও পুরাণের বৈচিত্র্যময় ধারাকে বোঝার ক্ষেত্রে শান্তার কাহিনি নিঃসন্দেহে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এনে দেয়। তাই রামায়ণের পরিচিত চরিত্রগুলোর বাইরে শান্তার জীবন সম্পর্কেও আগ্রহ বাড়ছে গবেষক, পাঠক এবং ধর্মীয় অনুরাগীদের মধ্যে।

