গামা রশ্মির পর্যবেক্ষণ, আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাসের মানচিত্র এবং উচ্চশক্তির বিকিরণের তথ্য পর্যালোচনা করে তারা দেখতে পান, LHAASO J1912+1014u অঞ্চলে এমন বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা একটি শক্তিশালী প্রোটন ত্বরকের উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। বিজ্ঞানীদের ভাষায়, এ ধরনের মহাজাগতিক উৎসকে বলা হয় প্রোটন পিভাট্রন (Proton PeVatron)। অর্থাৎ এমন একটি প্রাকৃতিক ব্যবস্থা, যা প্রোটনকে অন্তত এক পেটা-ইলেকট্রন ভোল্ট (১ PeV) বা তারও বেশি শক্তিতে ত্বরান্বিত করতে পারে।

মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাকৃতিক কণাত্বরকের সন্ধানে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনুসন্ধানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছেন বিজ্ঞানীরা। আন্তর্জাতিক একদল গবেষকের সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, আমাদের মিল্কিওয়ে ছায়াপথে অবস্থিত LHAASO J1912+1014u নামে পরিচিত একটি রহস্যময় মহাজাগতিক উৎস সম্ভবত এমন একটি প্রাকৃতিক ত্বরক, যা প্রোটনকে অবিশ্বাস্য উচ্চ শক্তিতে ত্বরান্বিত করতে সক্ষম। এই ফলাফল বহু দশক ধরে জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানে আলোচিত ‘কসমিক রে’ বা মহাজাগতিক রশ্মির উৎপত্তি-রহস্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রতিনিয়ত মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে অসংখ্য উচ্চশক্তির কণা এসে পৌঁছায়। এদের সম্মিলিতভাবে বলা হয় কসমিক রে। এই কণাগুলোর অধিকাংশই প্রোটন, তবে ইলেকট্রন এবং বিভিন্ন পরমাণুকণাও এর অংশ। শতাধিক বছর আগে কসমিক রশ্মির অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হলেও, এত বিপুল শক্তি নিয়ে এরা কোথা থেকে আসে এবং কীভাবে সেই শক্তি অর্জন করে — এই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর এতদিন পাওয়া যায়নি।
নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা পৃথিবী ও মহাকাশভিত্তিক তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণাগারের তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করেছেন। গামা রশ্মির পর্যবেক্ষণ, আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাসের মানচিত্র এবং উচ্চশক্তির বিকিরণের তথ্য পর্যালোচনা করে তারা দেখতে পান, LHAASO J1912+1014u অঞ্চলে এমন বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা একটি শক্তিশালী প্রোটন ত্বরকের উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।
বিজ্ঞানীদের ভাষায়, এ ধরনের মহাজাগতিক উৎসকে বলা হয় প্রোটন পিভাট্রন (Proton PeVatron)। অর্থাৎ এমন একটি প্রাকৃতিক ব্যবস্থা, যা প্রোটনকে অন্তত এক পেটা-ইলেকট্রন ভোল্ট (১ PeV) বা তারও বেশি শক্তিতে ত্বরান্বিত করতে পারে। এক পেটা-ইলেকট্রন ভোল্টের অর্থ প্রায় ১০¹⁵ ইলেকট্রন ভোল্ট শক্তি। তুলনামূলকভাবে এটি মানুষের নির্মিত বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত কণাত্বরকগুলোর উৎপাদিত শক্তির চেয়েও অনেক বেশি।
দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, সুপারনোভা বিস্ফোরণের পর অবশিষ্ট ধ্বংসাবশেষ, অত্যন্ত শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র এবং শক-তরঙ্গ কসমিক রশ্মিকে উচ্চ শক্তিতে ত্বরান্বিত করতে পারে। কিন্তু এ ধরনের ধারণার পক্ষে প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণভিত্তিক প্রমাণ খুবই সীমিত ছিল। নতুন গবেষণাটি সেই ঘাটতি অনেকটাই পূরণ করেছে।
গবেষণায় দেখা যায়, LHAASO J1912+1014u থেকে নির্গত উচ্চশক্তির গামা রশ্মির বৈশিষ্ট্য এমন একটি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে অতিদ্রুত প্রোটন আশপাশের গ্যাসের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে গামা রশ্মি সৃষ্টি করছে। এই ধরনের বিকিরণকে কসমিক রশ্মির উৎপত্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান ফলাফল অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও এটিকে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে ঘোষণা করা হচ্ছে না। ভবিষ্যতে আরও উন্নত মানমন্দির ও দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই ব্যাখ্যা আরও দৃঢ়ভাবে যাচাই করা হবে। বিজ্ঞানচর্চায় নতুন তথ্যের আলোকে ধারণা পরিমার্জনের সুযোগ সবসময়ই থাকে, আর এই গবেষণাও তার ব্যতিক্রম নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কসমিক রশ্মির উৎস সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া গেলে শুধু একটি দীর্ঘদিনের বৈজ্ঞানিক রহস্যের সমাধানই হবে না, বরং মহাবিশ্বের চরম পরিবেশ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানও অনেক বিস্তৃত হবে। কারণ এই উচ্চশক্তির কণাগুলো ছায়াপথের গ্যাসের গঠন, চৌম্বক ক্ষেত্রের বিবর্তন এবং নতুন নক্ষত্র সৃষ্টির পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানে কসমিক রে এক ধরনের বিশেষ বার্তাবাহক হিসেবে বিবেচিত হয়। আমরা সাধারণত টেলিস্কোপে আলো পর্যবেক্ষণ করে মহাবিশ্বকে জানার চেষ্টা করি। কিন্তু কসমিক রশ্মি এমন সব সহিংস মহাজাগতিক ঘটনার তথ্য বহন করে, যেগুলো শুধুমাত্র দৃশ্যমান আলো দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। তাই এদের উৎস শনাক্ত করা মানে মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াগুলোর একটি জানালার সামনে দাঁড়ানো।
গবেষকদের আশা, আগামী দিনে আরও সংবেদনশীল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু হলে শুধু এই উৎস নয়, মিল্কিওয়ের আরও সম্ভাব্য প্রোটন পিভাট্রনের সন্ধান পাওয়া যাবে। এতে কসমিক রশ্মির উৎপত্তি, তাদের শক্তি অর্জনের প্রক্রিয়া এবং ছায়াপথে তাদের বিস্তারের ইতিহাস সম্পর্কে আরও নির্ভুল ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।
এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞান সাময়িকী The Astrophysical Journal-এ। গবেষণাপত্রটির প্রধান লেখক Tsunefumi Mizuno এবং তাঁর সহকর্মীরা। তাঁদের মতে, এই গবেষণা মহাজাগতিক কণাপদার্থবিজ্ঞান ও উচ্চশক্তির জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করবে।
মহাবিশ্বের অদৃশ্য শক্তির উৎস খুঁজে বের করার এই প্রচেষ্টা এখনো শেষ হয়নি। তবে নতুন এই আবিষ্কার স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বহুদিনের এক বৈজ্ঞানিক ধাঁধার সমাধান হয়তো আর খুব দূরে নয়।

