সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রায়ে জানানো হয়েছে, দণ্ডিত ব্যক্তি নিজের সাজা নিয়ে আপিল করলে, সাজা বৃদ্ধির পৃথক আবেদন না থাকলে হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিতভাবে তাঁর শাস্তি বাড়াতে পারবে না। একই সঙ্গে একাধিক যাবজ্জীবন সাজা পরপর নয়, একইসঙ্গে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই রায় ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় আপিলের অধিকার, ন্যায্য বিচারপ্রক্রিয়া এবং সাজা নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত তৈরি করল।

ফৌজদারি মামলায় সাজা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আইনি অবস্থান স্পষ্ট করল সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালত জানিয়ে দিয়েছে, কোনও দণ্ডিত ব্যক্তি নিজের সাজা বা দোষী সাব্যস্ত হওয়ার বিরুদ্ধে আপিল করলে, সেই আপিলের শুনানির সময় হাইকোর্ট নিজের উদ্যোগে তাঁর সাজা আরও বাড়াতে পারে না। সাজা বাড়ানোর জন্য রাজ্য, অভিযোগকারী অথবা ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে পৃথক আপিল বা রিভিশন না থাকলে অভিযুক্তের নিজের আপিলকে হাতিয়ার করে তাঁর শাস্তি আরও কঠোর করা যাবে না।
১৮ আগস্ট ২০২৬-এ বিচারপতি মনোজ মিশ্র এবং বিচারপতি বিজয় বিষ্ণোইয়ের বেঞ্চ Gopi @ Sahaya Puruna v. The State মামলায় এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দেয়। মামলাটির নিরপেক্ষ সাইটেশন 2026 INSC 880। রায়ে সাজা সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও স্পষ্ট করেছে আদালত।
কী নিয়ে শুরু হয়েছিল আইনি লড়াই?
মামলাটি একটি গুরুতর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। নিম্ন আদালতে অভিযুক্ত গোপী ওরফে সাহায়া পুরুনার বিরুদ্ধে একাধিক ধারায় মামলা হয়। তাঁকে হত্যার পাশাপাশি অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, বাড়িতে অনধিকার প্রবেশ, অপহরণ, ডাকাতি এবং প্রমাণ নষ্ট করার মতো অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০০৭ সালের ৮ নভেম্বর তামিলনাড়ুর কন্যাকুমারী জেলায় একটি ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় এক নিরাপত্তারক্ষী ও এক চিকিৎসককে হত্যার অভিযোগ ওঠে। চিকিৎসকের স্ত্রীকেও অপহরণ করা হয় এবং পরে তাঁকে হত্যা করার অভিযোগ ছিল। এই মামলাতেই গোপীর বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর ধারায় সাজা দেওয়া হয়েছিল।
ট্রায়াল কোর্টের রায়ে গোপীকে একাধিক ধারায় দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং একাধিক সাজা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি মাদ্রাজ হাইকোর্টে যায়। সেখানে মামলার শুনানির সময় হাইকোর্ট নিজের suo motu, অর্থাৎ স্বতঃপ্রণোদিত সংশোধনমূলক ক্ষমতা ব্যবহার করে সাজা আরও কঠোর করে।
হাইকোর্টের সিদ্ধান্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়, যার অর্থ ছিল দণ্ডিত ব্যক্তিকে তাঁর স্বাভাবিক জীবনের বাকি সময় জেলে থাকতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন সাজা পরপর কার্যকর করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে সাজাটি কার্যত আরও কঠোর হয়ে ওঠে।
সুপ্রিম কোর্টে উঠল মূল প্রশ্ন
শীর্ষ আদালতের সামনে মূল প্রশ্ন ছিল — একজন অভিযুক্ত যখন নিজের দোষী সাব্যস্ত হওয়া বা সাজা নিয়ে আপিল করেছেন, তখন সেই আপিলের শুনানির সময় হাইকোর্ট কি নিজের উদ্যোগে তাঁর সাজা বাড়াতে পারে? সুপ্রিম কোর্টের উত্তর ছিল স্পষ্ট — না।
আদালত বলেছে, অভিযুক্তের করা আপিলের ক্ষেত্রে আদালত তাঁর সাজা বহাল রাখতে পারে, পরিস্থিতি অনুযায়ী তা কমাতেও পারে। কিন্তু শুধু অভিযুক্তের আপিলের শুনানির সুযোগে তাঁর অবস্থাকে আরও খারাপ করে দেওয়া যাবে না।
কারণ, কোনও ব্যক্তি যদি মনে করেন তাঁর সাজা অন্যায়ভাবে বেশি হয়েছে এবং সেই কারণে তিনি উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন, তাহলে শুধুমাত্র আপিল করার কারণেই তাঁর শাস্তি আরও বাড়িয়ে দেওয়া হলে আপিলের অধিকার কার্যত ঝুঁকির মুখে পড়বে। সুপ্রিম কোর্ট এই দৃষ্টিভঙ্গিকেই গুরুত্ব দিয়েছে।
রাজ্য বা ভুক্তভোগী আপিল করলে কী হবে?
এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে কোনও পরিস্থিতিতেই আদালত সাজা বাড়াতে পারবে না।
সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছে, সাজা বৃদ্ধির জন্য রাজ্য, ভুক্তভোগী বা অভিযোগকারীর পক্ষ থেকে পৃথক আপিল বা রিভিশন থাকলে আদালত সেই আবেদন বিবেচনা করতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে অভিযুক্তকে সাজা বাড়ানোর প্রস্তাবের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখার যথেষ্ট সুযোগ দিতে হবে।
অর্থাৎ, সাজা বৃদ্ধির প্রশ্নে আইনি প্রক্রিয়াটি আলাদা হতে হবে। শুধুমাত্র অভিযুক্তের নিজের আপিলের মধ্যে ঢুকে আদালত স্বতঃপ্রণোদিতভাবে তাঁর শাস্তি বাড়িয়ে দিতে পারে না।
যাবজ্জীবন সাজা কি পরপর চলতে পারে?
এই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করেছে। কোনও ব্যক্তিকে একাধিক অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলেও সেই যাবজ্জীবন সাজাগুলিকে একটির পর আরেকটি হিসেবে consecutive, অর্থাৎ পরপর চালানোর নির্দেশ দেওয়া যায় না।
একইভাবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সঙ্গে নির্দিষ্ট মেয়াদের কারাদণ্ড থাকলেও সেগুলিকে এমনভাবে পরপর চালানোর নির্দেশ দেওয়া যাবে না, যাতে সাজাগুলি বাস্তবে এক জীবনের পর আরেক জীবনের মতো কার্যকর হয়।
আদালত নির্দেশ দিয়েছে, এই মামলায় গোপীর বিভিন্ন সাজা concurrently, অর্থাৎ একই সময়ে চলবে। এই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট পূর্ববর্তী সাংবিধানিক বেঞ্চের রায়ের নীতির ওপরও নির্ভর করেছে।
“যাবজ্জীবন” এবং “জীবনের শেষ পর্যন্ত কারাবাস” — পার্থক্য কোথায়?
রায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং একজন বন্দিকে তাঁর স্বাভাবিক জীবনের অবশিষ্ট সময় জেলে রাখার নির্দেশের মধ্যে পার্থক্য।
সুপ্রিম কোর্টের বক্তব্য অনুযায়ী, “life imprisonment” নিজেই একটি গুরুতর ও দীর্ঘমেয়াদি শাস্তি। কিন্তু কোনও হাইকোর্ট যদি একজন দণ্ডিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে তাঁর স্বাভাবিক জীবনের শেষ পর্যন্ত কারাবাসের মতো আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে চায়, তার জন্য আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি।
অভিযুক্ত নিজে যখন নিজের সাজা নিয়ে আপিল করেছেন, তখন সেই আপিলের শুনানির মধ্যে তাঁকে আরও কঠোর অবস্থায় ঠেলে দেওয়ার সুযোগ আদালতের নেই — এই নীতিই ফের স্পষ্ট করেছে শীর্ষ আদালত।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই রায়?
ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় এই রায়ের গুরুত্ব যথেষ্ট। কারণ, একজন দণ্ডিত ব্যক্তির উচ্চ আদালতে যাওয়ার অধিকার যাতে বাস্তবে তাঁর বিরুদ্ধে নতুন ঝুঁকি তৈরি না করে, সেই বিষয়টি আদালত গুরুত্ব দিয়ে দেখেছে।
আগেও Nagarajan v. State of Tamil Nadu মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, অভিযুক্তের করা আপিলের শুনানির সময় হাইকোর্ট নিজের revisional jurisdiction ব্যবহার করে তাঁর সাজা বাড়াতে পারে না, যদি রাজ্য, ভুক্তভোগী বা অভিযোগকারীর পক্ষ থেকে সাজা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় আপিল বা রিভিশন না থাকে। ২০২৬ সালের Gopi মামলার রায়ে সেই নীতিই আরও একবার প্রয়োগ করা হয়েছে।
আইনি বিশেষজ্ঞদের কাছে এর তাৎপর্য হল — আপিলের অধিকার শুধু কাগজে-কলমে থাকা অধিকার নয়; সেই অধিকার ব্যবহার করলে অভিযুক্তকে শুধুমাত্র আপিল করার কারণে আরও খারাপ অবস্থায় ফেলে দেওয়া যাবে না।
সাধারণ মানুষের জন্য রায়ের সহজ অর্থ
সহজভাবে বললে, কোনও ব্যক্তি যদি আদালতের দেওয়া সাজাকে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে যান, তাহলে তাঁর আপিলের শুনানিতে আদালত তাঁর সাজা কমাতে পারে, বহাল রাখতে পারে কিংবা আইন অনুযায়ী অন্য উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু রাজ্য বা ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে সাজা বাড়ানোর আবেদন না থাকা অবস্থায় শুধুমাত্র নিজের উদ্যোগে আদালত সাজা বাড়িয়ে দিতে পারবে না।
তবে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে সাজা বৃদ্ধির প্রয়োজন মনে হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষ আইন অনুযায়ী পৃথক আপিল করতে পারে। তখন আদালত সেই আবেদন শুনে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে এবং অভিযুক্তকে নিজের বক্তব্য জানানোর সুযোগ দিতে হবে।
রায়ের মূল বার্তা
Gopi @ Sahaya Puruna মামলায় সুপ্রিম কোর্ট মূলত দুটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি সামনে এনেছে —
প্রথমত, অভিযুক্তের নিজের আপিলের শুনানিতে তাঁর সাজা স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বাড়ানো যাবে না, যদি সাজা বৃদ্ধির জন্য রাজ্য, ভুক্তভোগী বা অভিযোগকারীর পৃথক আবেদন না থাকে।
দ্বিতীয়ত, একাধিক যাবজ্জীবন সাজা কিংবা যাবজ্জীবন ও নির্দিষ্ট মেয়াদের সাজাকে পরপর কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া যাবে না; সংশ্লিষ্ট সাজাগুলি একইসঙ্গে চলবে।
ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় ন্যায্য প্রক্রিয়া, আপিলের অধিকার এবং সাজা নির্ধারণের সীমা — এই তিন ক্ষেত্রেই রায়টি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল।

