শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিনে ফিরে দেখা তাঁর অমর সৃষ্টি ‘দেবদাস’-কে। ১৯৩৫-এর ট্র্যাজিক প্রেমিক থেকে ১৯৫৫-এর মানবিক দেবদাস, ২০০২-এর মহাকাব্যিক প্রেমের প্রতীক এবং ২০০৯-এর আধুনিক, আত্মকেন্দ্রিক যুবক — সময় বদলের সঙ্গে বদলেছে চরিত্রটির ব্যাখ্যাও। প্রেম, বিরহ, অহংকার ও আত্মবিধ্বংসের এই গল্প তাই আজও নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন অর্থে ফিরে আসে। একই গল্প, অথচ প্রতিটি যুগে একেবারে আলাদা দেবদাসের জন্ম হয়।

আজ ১৫ সেপ্টেম্বর। বাংলা সাহিত্যের অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন। ১৮৭৬ সালের এই দিনে হুগলির দেবানন্দপুরে জন্মেছিলেন সেই সাহিত্যিক, যাঁর কলমে প্রেম কখনও নিঃশব্দ কান্না, কখনও সামাজিক প্রতিবাদ, আবার কখনও হয়ে উঠেছে মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত অসহায়তার গল্প।
শরৎচন্দ্রের সৃষ্ট চরিত্রগুলির মধ্যে ‘দেবদাস’ সম্ভবত সবচেয়ে বেশি বার ফিরে এসেছে রুপোলি পর্দায়। কিন্তু মজার বিষয়, প্রতিবার ফিরে আসার সময় দেবদাস যেন একই মানুষ থাকেনি। সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, প্রেমের সংজ্ঞা বদলেছে। আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে গেছে দেবদাসও।
একসময় যে যুবককে দেখে দর্শকের চোখে জল আসত, পরের প্রজন্মের কাছে সেই মানুষটিই কখনও দুর্বল, কখনও আত্মকেন্দ্রিক, কখনও আবার এক অসম্ভব রোমান্টিক চরিত্র হয়ে উঠেছে।
উপন্যাসের দেবদাস : প্রেমিক, না কি নিজের কাছেই পরাজিত এক মানুষ?
শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ প্রথম প্রকাশিত হয় বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে। গল্পের কেন্দ্রে দেবদাস, পার্বতী বা পারো এবং চন্দ্রমুখী। কিন্তু এই ত্রিভুজ প্রেমকে শুধুমাত্র রোমান্টিক গল্প হিসেবে দেখলে মূল জায়গাটি হয়তো ধরা পড়ে না।
দেবদাস পারোকে ভালোবাসে। পারোও তাকে ভালোবাসে। অথচ ভালোবাসার জায়গায় দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস তার নেই। পরিবার, সামাজিক মর্যাদা এবং নিজের দ্বিধার কাছে বারবার পিছিয়ে যায় সে।
পারোর জীবনে যখন অন্য পুরুষ আসে, তখন দেবদাসের অনুশোচনা আরও তীব্র হয়। কিন্তু তখনও সে নিজের ভাগ্য বদলাতে পারে না। অন্যদিকে চন্দ্রমুখীর নিঃস্বার্থ ভালোবাসাও তাকে জীবনের দিকে ফিরিয়ে আনতে পারে না।
এই কারণেই শরৎচন্দ্রের দেবদাসকে নিখুঁত প্রেমিক বলা কঠিন। সে বরং এমন এক মানুষ, যে ভালোবাসে, হারায়, অনুতপ্ত হয় এবং শেষ পর্যন্ত নিজের দুর্বলতার কাছেই পরাজিত হয়।
১৯৩৫ : দেবদাস হয়ে উঠলেন ট্র্যাজিক প্রেমিক
পি.সি. বড়ুয়ার ১৯৩৫ সালের চলচ্চিত্র ‘দেবদাস’ গল্পটিকে প্রথম বড় পরিসরে দর্শকের সামনে নিয়ে আসে। বড়ুয়া নিজেই দেবদাসের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
এই ছবির পর দেবদাসের পরিচয় আরও জোরালোভাবে তৈরি হয় একজন ‘বিরহী প্রেমিক’ হিসেবে। তার কষ্ট, বিচ্ছেদ, মদ্যপান এবং মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া দর্শকের কাছে এক গভীর ট্র্যাজেডির রূপ নেয়।
এখান থেকেই ধীরে ধীরে তৈরি হতে থাকে সেই জনপ্রিয় ধারণা — দেবদাস মানেই অসমাপ্ত প্রেম, চোখের জল আর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রিয় মানুষের কাছে পৌঁছতে না পারার যন্ত্রণা।
১৯৫৫ : দিলীপ কুমারের দেবদাস আরও মানবিক
দুই দশক পরে বিমল রায়ের ‘দেবদাস’ গল্পটিকে অন্যভাবে দেখল। ১৯৫৫ সালের এই ছবিতে দিলীপ কুমার, সুচিত্রা সেন এবং বৈজয়ন্তীমালা অভিনয় করেন।
এই সংস্করণে দেবদাস শুধু প্রেমে ব্যর্থ একজন যুবক নয়; সে একজন দ্বিধাগ্রস্ত, ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়া মানুষ। তার দুর্বলতা, অপরাধবোধ এবং অসহায়তাকে আরও বাস্তব করে তুলেছিলেন দিলীপ কুমার।
পারো ও চন্দ্রমুখীর চরিত্রও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে প্রেমের গল্পটি শুধু দেবদাসের দুঃখের গল্প না থেকে তিনটি মানুষের আবেগ, আকাঙ্ক্ষা এবং অসম্ভব সম্পর্কের গল্প হয়ে ওঠে।
তারপর এল আরও অনেক দেবদাস
পরবর্তী দশকগুলিতে ভারতীয় সিনেমার বিভিন্ন ভাষায় ‘দেবদাস’ নানা রূপে ফিরে এসেছে। কোথাও গল্পটি মূল কাঠামোর কাছাকাছি থেকেছে, কোথাও স্থানীয় সংস্কৃতি ও সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে নতুনভাবে বলা হয়েছে।
প্রতিটি সংস্করণ আসলে নিজের সময়ের প্রেমকে দেখেছে। কোথাও প্রেম মানে আত্মত্যাগ, কোথাও সামাজিক বাধার বিরুদ্ধে লড়াই, কোথাও আবার প্রেম মানে নিজের আবেগের সঙ্গে যুদ্ধ।
এই কারণেই ‘দেবদাস’ শুধু একটি উপন্যাসের চরিত্র হয়ে থাকেনি। সে হয়ে উঠেছে ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতির এক দীর্ঘস্থায়ী প্রেমের প্রতীক।
২০০২ : শাহরুখের দেবদাস, প্রেমের মহাকাব্য
এরপর এল সঞ্জয় লীলা ভন্সালীর ২০০২ সালের ‘দেবদাস’। শাহরুখ খান, ঐশ্বর্য রাই এবং মাধুরী দীক্ষিতের অভিনয়ে এই ছবি দেবদাসকে নিয়ে গেল একেবারে অন্য জগতে।
এখানে প্রেম শুধু অনুভূতি নয়, তা হয়ে উঠল দৃশ্য, সঙ্গীত, রঙ, আলো এবং আবেগের এক বিশাল উৎসব।
শাহরুখের দেবদাস অত্যন্ত আবেগপ্রবণ। তার প্রেমে রয়েছে উন্মাদনা, অহংকার, অভিমান এবং আত্মবিধ্বংস। পারো হয়ে উঠলেন হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার প্রতীক, আর চন্দ্রমুখী পেলেন এমন এক আবেগ, যেখানে ভালোবাসার বিনিময়ে কিছু পাওয়ার দাবি নেই।
এই ছবির পর দেবদাস আরও বেশি করে ‘মহান ব্যর্থ প্রেমিক’-এর প্রতীকে পরিণত হন। বহু দর্শকের কাছে তার আত্মবিধ্বংসও যেন প্রেমের গভীরতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
২০০৯ : ‘Dev.D’-তে দেবদাসকে আর নায়ক মনে হল না
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত আসে অনুরাগ কাশ্যপের ‘Dev.D’-তে। এখানে দেবদাস আর সেই পুরনো সময়ের প্রেমিক নয়। আধুনিক ভারতের এক যুবক — স্বার্থপর, বিভ্রান্ত, কামনা-বাসনায় জর্জরিত এবং নিজের সিদ্ধান্তের ফল ভোগ করতে বাধ্য।
এই ছবিতে প্রেমকে পবিত্র স্মৃতির মতো দেখানো হয়নি। বরং প্রশ্ন করা হয়েছে, ভালোবাসার নামে একজন মানুষ নিজের ভুলের দায় এড়িয়ে যেতে পারে কি?
ফলে ‘Dev.D’-এর দেবদাসকে নিয়ে দর্শকের সহানুভূতি যেমন তৈরি হয়, তেমনই তার প্রতি বিরক্তিও জন্মায়। সে আর শুধুই করুণ নায়ক নয়; সে নিজের ভুলের জন্য দায়ী একজন অসম্পূর্ণ মানুষ।
তাহলে সবচেয়ে বেশি বদলেছে কে? দেবদাস, না প্রেম?
আসলে দেবদাসের পরিবর্তনের গল্পটি যতটা তার চরিত্রের, তার চেয়ে বেশি দর্শকের মানসিকতার। একসময় সমাজ মনে করত, প্রেমে ব্যর্থ পুরুষের আত্মবিধ্বংস এক ধরনের রোমান্টিক ট্র্যাজেডি। পরে মানুষ প্রশ্ন করতে শুরু করল, কেন সে লড়ল না? কেন পারোর সিদ্ধান্তকে সম্মান করল না? কেন নিজের জীবনের দায় অন্যের ওপর চাপাল?
সেই প্রশ্নের ফলেই দেবদাস ধীরে ধীরে ‘মহান প্রেমিক’ থেকে ‘ত্রুটিপূর্ণ মানুষ’-এ পরিণত হয়েছে।
আর এখানেই শরৎচন্দ্রের সৃষ্টির আশ্চর্য শক্তি। প্রায় এক শতাব্দী পরেও চরিত্রটি পুরনো হয়ে যায়নি। বরং নতুন সময় তাকে নতুন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
পারো ও চন্দ্রমুখী : দেবদাসের চেয়েও কি তাঁরা বেশি বদলেছেন?
দেবদাসের গল্প নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রায়ই পারো ও চন্দ্রমুখীকে আড়ালে রেখে দেওয়া হয়। অথচ সময়ের সঙ্গে এই দুই নারী চরিত্রের পাঠও বদলেছে।
পুরনো পাঠে পারো যেন হারিয়ে যাওয়া প্রেম। কিন্তু আধুনিক পাঠে তিনি নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া এক নারী। চন্দ্রমুখীকেও শুধু ‘পতিতা’ পরিচয়ে আটকে না রেখে একজন অনুভূতিশীল, ভালোবাসতে জানা এবং অন্যের কষ্ট বুঝতে পারা মানুষ হিসেবে দেখার প্রবণতা বেড়েছে।
অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে ‘দেবদাস’ বদলেছে শুধু পুরুষ চরিত্রের কারণে নয়। বদলেছে নারীকে দেখার চোখও।
আজকের দিনে দেবদাস হলে কী করত?
হয়তো আজকের দেবদাস ট্রেনের জানালায় বসে মদ হাতে শেষ যাত্রার অপেক্ষা করত না। হয়তো সে পারোকে নিজের মনের কথা বলত। হয়তো প্রত্যাখ্যান মেনে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করত। হয়তো মনোবিদের সাহায্য নিত। কিংবা হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের দুঃখ লিখে ফেলত!
কিন্তু সেই জায়গাতেই শরৎচন্দ্রের গল্পের চিরন্তন আকর্ষণ। সময় বদলালেও মানুষের প্রেম, ভয়, অহংকার, অনুশোচনা আর হারানোর যন্ত্রণা পুরোপুরি বদলায় না।
শরৎচন্দ্রের জন্মদিনে তাই ফিরে দেখা ‘দেবদাস’-কে
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিনে ‘দেবদাস’-কে মনে করার অর্থ শুধু একটি পুরনো প্রেমের গল্পকে মনে করা নয়। বরং নিজের সময়ের প্রেমকে নতুন করে দেখা।
১৯৩৫-এর দেবদাস আমাদের কাঁদিয়েছে। ১৯৫৫-এর দেবদাস আমাদের তার ভেতরের মানুষটিকে দেখিয়েছে। ২০০২-এর দেবদাস প্রেমকে মহাকাব্যের মতো সাজিয়েছে। আর ২০০৯-এর দেবদাস আমাদের সামনে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে — ভালোবাসার ব্যর্থতার জন্য কি সত্যিই অন্য কেউ দায়ী?
একই গল্প, একই নাম, একই অসমাপ্ত প্রেম — তবু প্রতিটি যুগে আলাদা দেবদাস।
সম্ভবত এটাই শরৎচন্দ্রের সৃষ্টির সবচেয়ে বড় জাদু। তাঁর দেবদাস মরে গেছে গল্পের শেষে, কিন্তু প্রেমের পৃথিবীতে সে বারবার ফিরে এসেছে। কখনও চোখের জলে, কখনও গানে, কখনও পর্দার আলো-আঁধারিতে, আবার কখনও আমাদের নিজেদের ভুল আর অসমাপ্ত ভালোবাসার আয়নায়।
তাই দেবদাসের গল্প আসলে শেষ হয়নি। শুধু প্রতিটি প্রজন্ম এসে তার শেষটুকু নিজের মতো করে লিখেছে।

