ঝাড়খণ্ডে সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম ও প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে ছাত্র ও চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন ঘিরে ১০ আগস্ট রাঁচিতে উত্তেজনা ছড়ায়। বিধানসভা অভিযানের সময় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জলকামান, কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করা হয়। ঘটনার প্রতিবাদে ১১ আগস্ট রাজ্যজুড়ে বন্ধ-এর ডাক দেয় বিজেপি। ছাত্রদের দাবি, নিয়োগ পরীক্ষার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ঝাড়খণ্ডে ছাত্র ও চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন আরও বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ১০ আগস্ট রাঁচিতে বিধানসভা অভিমুখে ছাত্রদের মিছিলকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, জলকামান, কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জের ঘটনায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সেই ঘটনার প্রতিবাদে ১১ আগস্ট মঙ্গলবার ঝাড়খণ্ডজুড়ে বন্ধের ডাক দিয়েছে বিজেপি। ফলে ছাত্রদের নিয়োগ পরীক্ষা-কেন্দ্রিক আন্দোলন এখন রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে।
কী নিয়ে ছাত্রদের আন্দোলন?
ঝাড়খণ্ডের সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই পরীক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন বা JPSC এবং ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশন বা JSSC-এর কয়েকটি নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, নিয়োগ পরীক্ষার ক্ষেত্রে অনিয়ম, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং পরীক্ষার ফলাফল ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। তাঁদের দাবি, অভিযোগগুলির নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে বিতর্কিত পরীক্ষা বাতিল করে নতুন করে পরীক্ষা নিতে হবে। আন্দোলনকারীদের একটি বড় দাবি হলো, পুরো বিষয়টি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা CBI-এর মাধ্যমে তদন্ত করা।
ছাত্রদের বক্তব্য, সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ শুধু একটি পরীক্ষার সমস্যা নয়। এর সঙ্গে হাজার হাজার পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জড়িয়ে রয়েছে। বহু বছর ধরে প্রস্তুতি নেওয়ার পর পরীক্ষার প্রক্রিয়ায় কোনও ধরনের অনিয়ম হলে তাঁদের সময়, অর্থ এবং ভবিষ্যৎ — সবকিছুই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
১০ আগস্ট কী ঘটেছিল?
এই দাবিগুলিকে সামনে রেখে ১০ আগস্ট রাঁচিতে বড় মিছিলের আয়োজন করা হয়। ছাত্র ও চাকরিপ্রার্থীরা বিধানসভা অভিমুখে এগিয়ে যাওয়ার কর্মসূচি নেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগে থেকেই বিধানসভা এলাকার নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছিল এবং বিভিন্ন জায়গায় ব্যারিকেড বসানো হয়।
মিছিল বিধানসভা এলাকার দিকে এগোতে থাকলে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের উত্তেজনা তৈরি হয়। এক পর্যায়ে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ ব্যারিকেড অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ তাঁদের থামানোর চেষ্টা করে। এরপর দু’পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। পরে লাঠিচার্জের ঘটনাও ঘটে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘর্ষের ঘটনায় কয়েকজন বিক্ষোভকারী আহত হন। পুলিশের পক্ষ থেকেও কয়েকজন কর্মী আহত হওয়ার কথা জানানো হয়। রাঁচি পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, পাথর ছোড়ার ঘটনায় চারজন পুলিশকর্মী আহত হন। অন্যদিকে, আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, তাঁদের ওপর পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ হয়েছে। তবে উভয় পক্ষের আহতের মোট সংখ্যা নিয়ে নির্দিষ্ট সরকারি হিসাব স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়নি।
পুলিশের বক্তব্য ছিল, বিধানসভা একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা এলাকা হওয়ায় সেখানে মিছিলকারীদের প্রবেশ ঠেকানো জরুরি ছিল। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা দাবি করেন, তাঁরা নিজেদের দাবি-দাওয়া জানাতেই বিধানসভা অভিমুখে যাচ্ছিলেন।
ছাত্রদের দাবিতে অনড় আন্দোলনকারীরা
১০ আগস্টের বিক্ষোভে আন্দোলনকারীরা নিয়োগ পরীক্ষার কথিত অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি আরও জোরালো করেন। তাঁদের অন্যতম দাবি JSSC-CGL পরীক্ষার বাতিল এবং সংশ্লিষ্ট নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিষয়ে তদন্ত। CBI তদন্তের দাবিও সামনে এসেছে।
আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, শুধু কয়েকটি পরীক্ষা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রশ্নপত্র তৈরি থেকে শুরু করে পরীক্ষা পরিচালনা, উত্তরপত্র মূল্যায়ন এবং ফল প্রকাশ—পুরো নিয়োগ ব্যবস্থাতেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার বার্তা
১০ আগস্টের ঘটনার পর ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের বার্তা দিয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ছাত্রদের বক্তব্য উপেক্ষা করা হবে না এবং আলোচনার মাধ্যমে তাঁদের অভিযোগের সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
সরকারের এই অবস্থান সত্ত্বেও আন্দোলন ঘিরে উত্তেজনা পুরোপুরি কাটেনি। ছাত্রদের একাংশ মনে করছেন, তাঁদের মূল দাবিগুলি নিয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।
১১ আগস্ট কেন বন্ধ?
১০ আগস্টের পুলিশি পদক্ষেপের প্রতিবাদে ১১ আগস্ট মঙ্গলবার ঝাড়খণ্ডজুড়ে বন্ধের ডাক দিয়েছে বিজেপি। দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ছাত্র ও চাকরিপ্রার্থীদের ওপর পুলিশি পদক্ষেপের প্রতিবাদেই এই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। বিজেপি জানিয়েছে, তারা ছাত্রদের দাবির পাশে রয়েছে এবং নিয়োগ পরীক্ষার কথিত অনিয়মের তদন্তের দাবি জানাবে।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন — ১১ আগস্টের বন্ধটি বিজেপির ডাকা রাজনৈতিক কর্মসূচি; এটি সরাসরি ছাত্রদের নিজস্ব কর্মসূচি নয়। ছাত্রদের নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে আন্দোলনের সঙ্গে বিজেপির এই বন্ধের রাজনৈতিক সমর্থন যুক্ত হয়েছে। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ছাত্র আন্দোলনের মূল দাবি এবং রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি এক বিষয় নয়।
বিজেপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ওপর পুলিশ বলপ্রয়োগ করেছে। সেই ঘটনার প্রতিবাদেই রাজ্যব্যাপী বন্ধের ডাক দেওয়া হয়েছে। দলীয় নেতৃত্ব ছাত্রদের দাবিতে CBI তদন্তের মতো বিষয়গুলিও সামনে এনেছে।
আন্দোলন কি আরও বড় আকার নেবে?
১০ আগস্টের ঘটনা এবং ১১ আগস্টের বন্ধের ডাকের ফলে ঝাড়খণ্ডের নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে চলা আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে। এর আগে বিষয়টি মূলত ছাত্র ও চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন হিসেবে সামনে থাকলেও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর তা রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রেও চলে এসেছে।
একদিকে রয়েছে ছাত্রদের নিয়োগ পরীক্ষায় স্বচ্ছতা, কথিত অনিয়মের তদন্ত এবং পরীক্ষার বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি। অন্যদিকে রয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের বার্তা। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিরোধী বিজেপির রাজ্যব্যাপী বন্ধের কর্মসূচি।
পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসনের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা। একই সঙ্গে ছাত্রদের অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত এবং তাঁদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ বের করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নজরে এখন সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ
রাঁচির ১০ আগস্টের সংঘর্ষের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, সরকার ছাত্রদের দাবিগুলির বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়। নিয়োগ পরীক্ষার অনিয়মের অভিযোগের তদন্ত কীভাবে হবে, বিতর্কিত পরীক্ষাগুলি নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং CBI তদন্তের দাবি আদৌ গ্রহণ করা হবে কি না — এসব বিষয় এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
অন্যদিকে ১১ আগস্টের বন্ধ কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিও নজরে রয়েছে। ছাত্রদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলির সক্রিয়তা বাড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। আবার সরকার যদি আলোচনার মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তাহলে উত্তেজনা কমার সম্ভাবনাও রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ১০ আগস্ট রাঁচির বিধানসভা অভিযান ছিল ছাত্র আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়, আর ১১ আগস্টের বন্ধ সেই ঘটনাকে রাজ্যব্যাপী রাজনৈতিক প্রতিবাদের রূপ দিয়েছে। এখন নিয়োগ পরীক্ষার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ছাত্রদের সঙ্গে সরকারের আলোচনাই পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে।

