মারখোর মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার দুর্গম পাহাড়ে বসবাসকারী এক আশ্চর্য বন্য ছাগল। পাকানো বিশাল শিং ও পাহাড়ে চলাফেরার অসাধারণ দক্ষতার জন্য এটি পরিচিত। পাকিস্তানের জাতীয় প্রাণী মারখোর বর্তমানে আবাসস্থল ধ্বংস, অবৈধ শিকার ও জলবায়ু পরিবর্তনের চাপে রয়েছে। সংরক্ষণ উদ্যোগের মাধ্যমে এর সংখ্যা রক্ষার চেষ্টা চলছে। ২০২৪ সাল থেকে ২৪ মে আন্তর্জাতিক মারখোর দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে।

পৃথিবীর বন্যপ্রাণী জগতে এমন কিছু প্রাণী রয়েছে, যাদের চেহারা ও জীবনযাপন প্রকৃতির বিস্ময়কে নতুন করে সামনে আনে। মারখোর (Capra falconeri) তেমনই এক আশ্চর্য প্রাণী। দেখতে অনেকটা বন্য ছাগলের মতো হলেও এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হল মাথা থেকে পাক খেতে খেতে ওপরে উঠে যাওয়া বিশাল শিং। দুর্গম পাহাড়ি পরিবেশে অবিশ্বাস্য দক্ষতায় চলাফেরা করা এই প্রাণীটি মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার পার্বত্য অঞ্চলের অন্যতম উল্লেখযোগ্য স্তন্যপায়ী।
মারখোরকে পাকিস্তানের জাতীয় প্রাণী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আফগানিস্তান, ভারত, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তানের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকাতেও এই প্রাণীর দেখা মেলে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে পূর্ণবয়স্ক মারখোরের সংখ্যা আনুমানিক ৫,৭০০। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা বা IUCN-এর তালিকায় প্রজাতিটি ‘Near Threatened’ বা বিপন্নতার কাছাকাছি অবস্থায় রয়েছে।
পাকানো শিংই সবচেয়ে বড় পরিচয়
মারখোরের শরীরের সবচেয়ে চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য তার শিং। পুরুষ মারখোরের শিং সাধারণত অনেক বড় এবং কর্কস্ক্রুর মতো পাকানো। শিংয়ের এই বিশেষ আকৃতি তাকে অন্য অনেক বন্য ছাগল থেকে সহজেই আলাদা করে দেয়। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, মারখোরের শিং প্রায় ৬৩ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। নারী মারখোরের শিং তুলনামূলকভাবে ছোট।
পুরুষ প্রাণীর চিবুক, গলা, বুক ও পায়ের অংশে লম্বা লোম দেখা যায়। অন্যদিকে স্ত্রী মারখোর তুলনামূলকভাবে ছোট এবং তাদের লোমও কম ঘন। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের শরীরের লোমের ঘনত্ব ও রংও কিছুটা বদলে যায়।
কোথায় দেখা যায় মারখোর?
মারখোর মূলত দুর্গম পাহাড়ি পরিবেশের বাসিন্দা। সাধারণত খোলা পাহাড়ি বন, ঝোপঝাড় এবং পাথুরে ঢালে এদের বিচরণ করতে দেখা যায়। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এরা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬০০ থেকে ৩,৬০০ মিটার উচ্চতার এলাকাতেও বসবাস করতে পারে।
ভারতে মারখোরের বিস্তার মূলত জম্মু ও কাশ্মীরের পির পাঞ্জাল পর্বতমালার কিছু অংশে সীমাবদ্ধ। পাকিস্তানে চিত্রালসহ বিভিন্ন পার্বত্য অঞ্চলে এর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল রয়েছে। মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশেও বিচ্ছিন্ন মারখোরের জনসংখ্যা রয়েছে।
পাহাড়ে চলাফেরায় অসাধারণ দক্ষ
মারখোরের জীবনযাত্রার অন্যতম বিস্ময়কর দিক হল দুর্গম পাহাড়ে চলাফেরার ক্ষমতা। খাড়া পাথুরে ঢাল, সরু পাহাড়ি পথ এবং উঁচু-নিচু ভূখণ্ডেও তারা তুলনামূলক সহজে চলতে পারে। এই অভিযোজন তাদের শিকারিদের হাত থেকে বাঁচতে এবং পাহাড়ি পরিবেশে খাবার খুঁজে পেতে সাহায্য করে।
মারখোর তৃণভোজী প্রাণী। ঋতুভেদে তারা ঘাস, পাতা, ঝোপের অংশ ও বিভিন্ন উদ্ভিদ খেয়ে থাকে। শীতকালে যখন নিচু পাহাড়ি এলাকায় খাদ্যের ধরন বদলে যায়, তখন তারা গাছপালা ও ঝোপের পাতা খাওয়ার ওপর বেশি নির্ভর করতে পারে।
‘সাপখেকো’ নামের পেছনে রয়েছে লোককথা
‘মারখোর’ নামটি নিয়েও রয়েছে চমকপ্রদ একটি গল্প। নামটির উৎস ফারসি ভাষার দুটি শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয় — ‘মার’, অর্থ সাপ এবং ‘খোর’, অর্থ ভক্ষক বা খাদক। এ থেকেই ‘সাপখেকো’ অর্থের ধারণা তৈরি হয়েছে।
তবে বাস্তবে মারখোর সাপ খেয়ে বেঁচে থাকে না। এটি মূলত সম্পূর্ণ তৃণভোজী প্রাণী। সাপ হত্যা বা সাপ খাওয়ার ক্ষমতা নিয়ে প্রচলিত ধারণাটি মূলত লোককথা ও ঐতিহ্যের অংশ।
অস্তিত্বের ওপর হুমকি
অসাধারণ সৌন্দর্য ও পাহাড়ি পরিবেশে অভিযোজনের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও মারখোর পুরোপুরি নিরাপদ নয়। আবাসস্থল ধ্বংস, অবৈধ শিকার, চোরাশিকার এবং জলবায়ু পরিবর্তন — সবই এই প্রাণীর ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি। জাতিসংঘও এসব কারণকে মারখোরের জন্য প্রধান ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
একসময় বিভিন্ন অঞ্চলে মারখোরের বিস্তৃত বিচরণ থাকলেও মানুষের কার্যকলাপের কারণে অনেক এলাকায় তাদের সংখ্যা ও আবাসস্থল কমেছে। পাহাড়ি বন উজাড়, মানুষের বসতি বৃদ্ধি এবং অবৈধ শিকার বন্যপ্রাণীটির স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি করেছে।
সংরক্ষণে মিলছে আশার আলো
তবে মারখোরকে রক্ষায় বিভিন্ন দেশে সংরক্ষণমূলক উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। সংরক্ষিত বনাঞ্চল, শিকার নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সংরক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করার মতো পদক্ষেপ কিছু এলাকায় ইতিবাচক ফল দিয়েছে।
মারখোর সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০২৪ সালে ২৪ মে-কে International Day of the Markhor হিসেবে ঘোষণা করে। প্রথমবার আন্তর্জাতিকভাবে এই দিবস পালিত হয় ২০২৪ সালে। এর উদ্দেশ্য শুধু একটি প্রাণীকে রক্ষা করা নয়; মারখোরের সঙ্গে যুক্ত পাহাড়ি বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের গুরুত্বও তুলে ধরা।
প্রকৃতির এক অনন্য প্রতীক
মারখোর শুধু একটি সুন্দর বন্য ছাগল নয়; এটি মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার পাহাড়ি বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তার পাকানো শিং, দীর্ঘ লোম এবং দুর্গম পাহাড়ে টিকে থাকার অসাধারণ ক্ষমতা প্রাণীটিকে প্রকৃতির অন্যতম বিস্ময়কর সৃষ্টি করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মারখোরের আবাসস্থল রক্ষা করা গেলে শুধু এই প্রাণী নয়, একই সঙ্গে পাহাড়ি অঞ্চলের আরও বহু উদ্ভিদ ও প্রাণীও উপকৃত হবে। তাই মারখোর সংরক্ষণ আসলে বৃহত্তর পাহাড়ি পরিবেশ রক্ষারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
দুর্গম পাহাড়ে এখনও যে মারখোরের পাল দেখা যায়, তা প্রকৃতির স্থিতিস্থাপকতার এক অনন্য উদাহরণ। কিন্তু সেই অস্তিত্ব ধরে রাখতে হলে অবৈধ শিকার বন্ধ করা, প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা করা এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি। প্রকৃতির এই পাকানো-শিংয়ের বিস্ময় যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মও দেখতে পায় — সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

