ভারতের কয়েকটি রেলস্টেশন ও মেট্রো স্টেশনকে ঘিরে রয়েছে রহস্যময় ভূতের গল্প। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত পুরুলিয়ার বেগুনকোদর রেলস্টেশন। সাদা শাড়ি পরা নারীর ভূতের গুজবের জেরে স্টেশনটি প্রায় ৪২ বছর কার্যত বন্ধ ছিল। ২০০৯ সালে ফের চালু হয়। বারোগ, চিত্তুর ও রবীন্দ্র সরোবর নিয়েও রয়েছে নানা অলৌকিক কাহিনি, যদিও সেগুলোর বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

ভারতে রেলপথ শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য ইতিহাস, লোককথা এবং রহস্যময় কাহিনি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এমন কয়েকটি রেলস্টেশন ও মেট্রো স্টেশনের নাম শোনা যায়, যেগুলোকে স্থানীয় মানুষ কিংবা বিভিন্ন প্রতিবেদনে ‘ভূতুড়ে’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কোথাও রাতের অন্ধকারে অদ্ভুত ছায়ামূর্তি দেখার দাবি, কোথাও আবার মৃত্যুর পুরনো ঘটনাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে অলৌকিক গল্প।
তবে এই সব কাহিনির মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম বেগুনকোদর রেলস্টেশন। পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার এই স্টেশনকে ঘিরে এমন ভয় ছড়িয়েছিল যে, দীর্ঘ সময় সেখানে ট্রেন থামানো কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ৪২ বছর পর ২০০৯ সালে আবার স্টেশনটি চালু করা হয়। বর্তমানে অবশ্য বেগুনকোদর আর বন্ধ নয়।
বেগুনকোদর : ৪২ বছরের ‘নির্বাসন’
পুরুলিয়া জেলার বেগুনকোদর রেলস্টেশনটি ১৯৬০ সালের দিকে তৈরি হয়েছিল। স্থানীয় মানুষের যাতায়াতের ক্ষেত্রে স্টেশনটির গুরুত্ব ছিল যথেষ্ট। কিন্তু কয়েক বছর পরেই শুরু হয় নানা রহস্যময় গল্প।
প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, ১৯৬৭ সালে এক রেলকর্মী রাতে স্টেশন চত্বরে সাদা শাড়ি পরা এক মহিলাকে দেখতে পান বলে দাবি করেন। পরে ছড়িয়ে পড়ে, ওই মহিলা নাকি রেল দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন এবং তাঁর আত্মাই স্টেশন ও রেললাইনের আশপাশে ঘুরে বেড়াত।
এরপর স্টেশনটিকে ঘিরে ভয় আরও বাড়তে থাকে। স্থানীয়দের মধ্যে নানা ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। রেলকর্মীদের একাংশও সেখানে কাজ করতে অনিচ্ছুক ছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একসময় বেগুনকোদর কার্যত পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে এবং ট্রেন সেখানে থামা বন্ধ করে দেয়।
তবে এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ — স্টেশন বন্ধ হওয়ার সঙ্গে ভূতের গল্পের সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন বর্ণনা থাকলেও অলৌকিক ঘটনার কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। এমনকি তৎকালীন রাজনৈতিক নেতা ও স্থানীয়দের মধ্যে কেউ কেউ দাবি করেছিলেন, কর্মীদের সেখানে পোস্টিং এড়ানোর কারণেই ভূতের গল্প ছড়ানো হয়েছিল।
২০০৯ সালে আবার খুলল স্টেশন
বছরের পর বছর বন্ধ থাকার পর স্থানীয় বাসিন্দারা স্টেশনটি পুনরায় চালুর দাবি তুলতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত ২০০৯ সালে বেগুনকোদর স্টেশনে ফের যাত্রীবাহী ট্রেনের পরিষেবা শুরু হয়। অর্থাৎ, যে জায়গাকে একসময় ‘ভূতের স্টেশন’ বলে মানুষ এড়িয়ে চলত, সেখানেই আবার স্বাভাবিক রেল চলাচল শুরু হয়।
এরপরও অবশ্য পুরনো ভূতের গল্প পুরোপুরি মুছে যায়নি। রাতের দিকে স্টেশন ও রেললাইনের আশপাশে রহস্যময় নারীকে দেখা যায় — এমন দাবি মাঝেমধ্যেই সামনে এসেছে। কিন্তু এসব দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
২০১৭ সালে যুক্তিবাদীদের একটি দল রাত কাটিয়েছিল বেগুনকোদর স্টেশনে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল স্টেশনটি সত্যিই কোনও অতিপ্রাকৃত ঘটনার সঙ্গে যুক্ত কি না, তা নিজেরা পর্যবেক্ষণ করা। ওই রাতের পর্যবেক্ষণে তারা ভূত বা অলৌকিক উপস্থিতির কোনও প্রমাণ পায়নি বলে জানায়।
শুধু বেগুনকোদর নয়, আরও কয়েকটি স্টেশনকে ঘিরে রহস্য
বেগুনকোদর সবচেয়ে বেশি পরিচিত হলেও ভারতের আরও কয়েকটি রেলস্টেশন ও মেট্রো স্টেশনকে ঘিরে ভূতের গল্প রয়েছে –
বারোগ, টানেলের সঙ্গে জড়িয়ে পুরনো কাহিনি : হিমাচল প্রদেশের কালকা-শিমলা রেলপথের বারোগ অঞ্চল ও টানেলকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একটি রহস্যময় কাহিনি প্রচলিত। ব্রিটিশ আমলের কর্নেল বারোগের নামের সঙ্গে যুক্ত এই জায়গাকে নিয়ে নানা ধরনের ভূতের গল্প তৈরি হয়েছে। তবে এটিও মূলত লোককথা ও প্রচলিত গল্পের পর্যায়েই রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ভূতের কারণে বারোগ রেলস্টেশন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল — এমন নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। অর্থাৎ বেগুনকোদরের সঙ্গে এর তুলনা করা ঠিক হবে না।
চিত্তুর, সাদা পোশাকের নারীর গল্প : অন্ধ্রপ্রদেশের চিত্তুর রেলস্টেশনকেও বিভিন্ন ভ্রমণ ও রহস্যবিষয়ক প্রতিবেদনে ‘হন্টেড’ স্টেশন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, এক নারীর মৃত্যুর পর তাঁর আত্মাকে স্টেশনের আশপাশে দেখা যায় বলে দাবি রয়েছে। তবে এই ঘটনাগুলোরও কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বর্তমানে চিত্তুর রেলস্টেশন স্বাভাবিকভাবেই কার্যকর।
রবীন্দ্র সরোবর মেট্রো, কলকাতার ‘ভূতুড়ে’ স্টেশন : কলকাতার রবীন্দ্র সরোবর মেট্রো স্টেশন নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে নানা গল্প প্রচলিত। বিশেষ করে রাতের শেষ মেট্রোকে ঘিরে আত্মহত্যার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন অতিপ্রাকৃত কাহিনি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে। তবে এগুলোও মূলত লোকমুখে প্রচলিত গল্প। স্টেশনটি বর্তমানে চালু রয়েছে এবং কলকাতা মেট্রোর নিয়মিত পরিষেবার অংশ।
তাহলে সত্যিই কি কোনও স্টেশন ভূতের কারণে বন্ধ?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে বেগুনকোদরের ঘটনাকে আলাদা করে দেখতে হবে। বেগুনকোদর দীর্ঘ সময় ট্রেনের নিয়মিত যাত্রী পরিষেবা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল এবং স্টেশনটি প্রায় ৪২ বছর কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। কিন্তু ‘ভূতের কারণে রেল কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে স্টেশন বন্ধ করে দিয়েছিল’ — এই বক্তব্যকে সরলভাবে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে স্টেশন বন্ধ হওয়ার কারণ হিসেবে ভূতের আতঙ্ক, কর্মীদের অনীহা, স্থানীয় পরিস্থিতি এবং প্রশাসনিক বিষয় — সবকিছুর কথাই উঠে এসেছে।
অন্যদিকে বারোগ, চিত্তুর কিংবা রবীন্দ্র সরোবরের ক্ষেত্রে ভূতের গল্প থাকলেও এগুলো বর্তমানে চালু এবং ভূতের কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার নির্ভরযোগ্য নজির নেই।
ভূতের গল্প, নাকি মানুষের ভয়?
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, কোনও নির্জন জায়গা, অন্ধকার পরিবেশ, পুরনো মৃত্যু কিংবা রহস্যময় ঘটনার সঙ্গে মানুষের ভয় যুক্ত হলে সেখান থেকে সময়ের সঙ্গে লোককথা তৈরি হতে পারে। একটি মানুষের অভিজ্ঞতা বা দাবি পরে অনেক মানুষের মুখে ছড়িয়ে গিয়ে আরও নাটকীয় রূপ নিতে পারে।
বেগুনকোদরের ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটেছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হল, একসময় যে স্টেশনকে মানুষ ভয় পেত, সেটি এখন আবার রেল পরিষেবার অংশ।
এই কারণেই বেগুনকোদরের গল্প ভারতের রেল ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। একদিকে ৪২ বছর ধরে বন্ধ থাকা একটি স্টেশনের ইতিহাস, অন্যদিকে তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রহস্য ও লোকবিশ্বাস — দুইয়ের মিশ্রণেই তৈরি হয়েছে ‘ভূতুড়ে রেলস্টেশন’-এর কিংবদন্তি।
তবে রাখা দরকার, ভূতের অস্তিত্বের দাবির কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তাই বেগুনকোদর বা অন্য স্টেশনগুলোর গল্পকে বাস্তব অতিপ্রাকৃত ঘটনা হিসেবে নয়, বরং ইতিহাস, স্থানীয় বিশ্বাস ও লোককাহিনির অংশ হিসেবে দেখাই বেশি যুক্তিসঙ্গত।
বর্তমানে আলোচিত এই স্টেশনগুলোর মধ্যে বেগুনকোদর, বারোগ, চিত্তুর এবং রবীন্দ্র সরোবর — কোনওটিই ভূতের ভয়ে বন্ধ নেই। তবে বেগুনকোদরের ৪২ বছরের বন্ধ থাকার ইতিহাসই তাকে ভারতের সবচেয়ে আলোচিত ‘ভূতুড়ে রেলস্টেশন’-এর তালিকায় বিশেষ জায়গা দিয়েছে।

