নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সেপ্টেম্বর থেকেই ভারতের কাছ থেকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ আমদানির অনুমোদন চেয়েছে নেপাল। প্রয়োজন হলে ভারতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এই ঘটনায় দুই দেশের বিদ্যুৎ সহযোগিতা ও আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্যের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে।

নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের জেরে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা লেগেছে। একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন ক্ষমতা কমে গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের ঘাটতি সামাল দিতে ভারতের কাছ থেকে আগাম অতিরিক্ত বিদ্যুৎ আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে নেপাল। সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকেই ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন আগেভাগে দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
২৬ আগস্ট হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর নেপালের একাধিক নদী উপত্যকা ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস এবং হিমবাহ-সংক্রান্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জলবিদ্যুৎনির্ভর নেপালের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্প
নেপালের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার বড় অংশই জলবিদ্যুৎনির্ভর। সাম্প্রতিক বন্যায় একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন ক্ষমতার উল্লেখযোগ্য অংশ সাময়িকভাবে বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়েছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৩৬০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানা গিয়েছিল। পরবর্তী বিভিন্ন প্রতিবেদনে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫৫০ মেগাওয়াট পর্যন্ত হওয়ার কথাও উঠে এসেছে।
এই ক্ষতির ফলে শুধু নেপালের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ সরবরাহ নয়, ভারতমুখী বিদ্যুৎ রপ্তানিও প্রভাবিত হয়েছে। বন্যার আগে নেপাল থেকে ভারতে বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রায় ৮০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দুর্যোগের পরে সেই সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
ভারতের কাছে কেন বিদ্যুৎ চাইছে নেপাল?
নেপালের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৯০ শতাংশেরও বেশি জলবিদ্যুৎ থেকে আসে। ফলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় হলে জাতীয় গ্রিডে দ্রুত তার প্রভাব পড়ে। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত প্রকল্পগুলির মেরামত ও বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক করতে সময় লাগতে পারে। এই অন্তর্বর্তী সময়ে দেশের চাহিদা মেটাতে ভারতের কাছ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
নেপাল সাধারণত বর্ষাকালে নদীতে জলের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করে এবং সেই বিদ্যুতের একটি অংশ ভারতে রপ্তানি করে। শুষ্ক মৌসুমে উৎপাদন কমে গেলে আবার ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি সেই প্রচলিত ধারাকে বদলে দিয়েছে। বর্ষার সময়েই ভয়াবহ বন্যায় উৎপাদন ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নেপালকে আগেভাগেই ভারতের দিকে তাকাতে হচ্ছে।
ভারতের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় কতটা প্রভাব পড়বে?
নেপাল থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ায় ভারতের নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে না বলেই ভারতীয় কর্মকর্তাদের বক্তব্য। দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ চাহিদা এবং উৎপাদন সক্ষমতার মধ্যে পর্যাপ্ত ব্যবধান রয়েছে। ফলে নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি কমে গেলেও ভারতের জাতীয় গ্রিড তা সামাল দিতে পারবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বরং প্রয়োজন হলে নেপালকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ দেওয়ার বিষয়টি ভারত বিবেচনা করতে পারছে। বিদ্যুৎ বাণিজ্যের জন্য দুই দেশের মধ্যে ইতিমধ্যেই আন্তঃসীমান্ত সঞ্চালন পরিকাঠামো এবং বিদ্যমান বাণিজ্যিক ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
দুই দেশের বিদ্যুৎ সম্পর্কের নতুন দিক
ভারত ও নেপালের মধ্যে বিদ্যুৎ বাণিজ্য গত কয়েক বছরে দ্রুত বেড়েছে। নেপাল বর্ষাকালে অতিরিক্ত জলবিদ্যুৎ ভারতে বিক্রি করে এবং শুষ্ক সময়ে ভারতের কাছ থেকে বিদ্যুৎ নেয়। এই ব্যবস্থার ফলে দুই দেশের বিদ্যুৎ গ্রিডের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়ছে।
এবারের বন্যা সেই সম্পর্কের একটি ভিন্ন চিত্র সামনে এনেছে। যে সময়ে সাধারণত নেপাল থেকে ভারতে জলবিদ্যুৎ প্রবাহ বাড়ার কথা, সেই সময়েই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে নেপাল নিজেই বিদ্যুৎ ঘাটতির মুখে পড়েছে। ফলে ভারত থেকে নেপালে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
আঞ্চলিক বিদ্যুৎ নিরাপত্তায় গুরুত্ব
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনা হিমালয় অঞ্চলের জলবিদ্যুৎ পরিকাঠামোর ঝুঁকিও সামনে এনেছে। নেপাল দ্রুত জলবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াচ্ছে এবং দেশটির অর্থনীতি ও বিদ্যুৎ রপ্তানিতে এই খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু পাহাড়ি অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস, হিমবাহ ধস ও অতিবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের সঙ্গে বিদ্যুৎ বাণিজ্য শুধু বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিষয় নয়, বরং দুই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে উঠছে। নেপালের উৎপাদন ক্ষমতা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ভারতীয় বিদ্যুৎ দেশটির ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
সব মিলিয়ে, ভয়াবহ বন্যার কারণে নেপাল-ভারত বিদ্যুৎ বাণিজ্যের প্রচলিত সমীকরণ সাময়িকভাবে বদলে গেছে। নেপালের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলি মেরামত করে উৎপাদন স্বাভাবিক করতে কত সময় লাগে, তার ওপর আগামী দিনে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ আমদানির পরিমাণ নির্ভর করবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে নেপালের বিদ্যুৎ ঘাটতি সামাল দিতে ভারতের সহযোগিতা দুই প্রতিবেশী দেশের জ্বালানি সম্পর্ককে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

