নেপালের ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যয়, নিখোঁজ ১৩৩ ভারতীয়, উদ্ধারে জোর তৎপরতা

- Advertisement -

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ হড়পা বান ও ভূমিধসে ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নেপালে ১৫৭ জনের মৃত্যু এবং বহু মানুষের নিখোঁজ হওয়ার খবর মিলেছে। নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ১৩৩ জন ভারতীয় রয়েছেন। কলকাতার ৩২ সদস্যের একটি পর্যটক দলের সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। ভারতীয় ও নেপালি উদ্ধারকারী দল হেলিকপ্টারসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তল্লাশি চালাচ্ছে। পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক এবং উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

নেপালের ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যয়, নিখোঁজ ১৩৩ ভারতীয়, উদ্ধারে জোর তৎপরতা
Rescue teams conduct operations amid devastating floods in Nepal.

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে কার্যত বিপর্যস্ত জনজীবন। প্রবল জলস্রোতের সঙ্গে নেমে এসেছে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ। মুহূর্তের মধ্যে ভেসে গিয়েছে রাস্তা, সেতু, বাড়িঘর ও বিভিন্ন পরিকাঠামো। এই ভয়াবহ দুর্যোগে নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা প্রায় ১৬০-এ পৌঁছেছে। পাশাপাশি কয়েকশো মানুষ এখনও নিখোঁজ। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বহু বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ভারতীয়দের নিয়ে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৩৩ জন ভারতীয়ের এখনও কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি।

নেপালের রসুয়া ও আশপাশের পাহাড়ি এলাকায় দুর্যোগের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। প্রবল স্রোতে যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। বহু জায়গায় রাস্তা ও সেতু ধ্বংস হওয়ায় দুর্গম এলাকায় পৌঁছতে উদ্ধারকারী দলকে যথেষ্ট সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেপাল সেনা, পুলিশ ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীকে একযোগে কাজে নামানো হয়েছে। উদ্ধার ও ত্রাণের জন্য হেলিকপ্টারও ব্যবহার করা হচ্ছে।

কীভাবে ঘটল এত বড় বিপর্যয়?

প্রাথমিক পর্যায়ে ঘটনাটিকে ভূমিকম্প-পরবর্তী দুর্যোগ বলে মনে করা হলেও পরে বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে অন্য একটি সম্ভাবনা সামনে এসেছে। তিব্বতের দিকের পাহাড়ে হিমবাহের একটি বড় অংশ ভেঙে পড়ে বরফ, পাথর ও মাটির বিশাল স্তর নদীর গতিপথে নেমে আসে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে নদীতে আচমকা বিপুল পরিমাণ জল ও ধ্বংসাবশেষের চাপ তৈরি হয়। সেই জল ও কাদার প্রবল স্রোত অত্যন্ত দ্রুতগতিতে নিচের দিকে নেমে এসে নদীর আশপাশের এলাকা প্লাবিত করে। বহু মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার সুযোগও দেওয়া হয়নি।

ভারতীয়দের নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

এই দুর্যোগে ভারতীয় নাগরিকদের নিয়ে উদ্বেগের প্রধান কারণ হল, নেপাল হয়ে তিব্বতের কৈলাস-মানস সরোবর যাওয়ার পথে বহু ভারতীয় পর্যটক ও তীর্থযাত্রী ওই অঞ্চলে ছিলেন।

নেপালের পর্যটন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ১৩৩ জন ভারতীয়কে নিখোঁজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের অধিকাংশই কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার সঙ্গে যুক্ত বলে জানা যাচ্ছে। তবে নিখোঁজ মানেই মৃত্যু নয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় অনেকের অবস্থান সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক খবর সামনে এসেছে। কলকাতা থেকে কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রায় যাওয়া ৩২ জনের একটি দলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। ওই দলে ১৮ জন মহিলা এবং ১৪ জন পুরুষ ছিলেন বলে জানা গিয়েছে। তাঁরা ১৯ আগস্ট যাত্রা শুরু করেছিলেন।

কলকাতার এই দলের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর আরও কয়েকটি দলের সদস্য নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে তাঁদের পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে।

উদ্ধার অভিযানে সেনা ও হেলিকপ্টার

দুর্যোগের পর থেকেই নেপাল সরকার ব্যাপক উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে। সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দুর্গম এলাকায় পৌঁছে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। হেলিকপ্টারের সাহায্যে বহু মানুষকে নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

তবে উদ্ধার অভিযান সহজ নয়। কোথাও রাস্তা নেই, কোথাও সেতু ভেঙে পড়েছে। তার সঙ্গে রয়েছে কাদার স্তর ও ধ্বংসস্তূপ। পাহাড়ি এলাকার আবহাওয়াও উদ্ধারকারীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে নিখোঁজদের সন্ধানে সময় লাগছে।

নেপাল প্রশাসন জানিয়েছে, উদ্ধারকাজ আরও জোরদার করা হয়েছে এবং দুর্গম এলাকায় আটকে থাকা মানুষদের কাছে দ্রুত পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে নদী ও ধ্বংসস্তূপের আশপাশেও তল্লাশি চালানো হচ্ছে।

ভারতের তৎপরতা

নেপালের ভয়াবহ পরিস্থিতির পর ভারতও দ্রুত তৎপর হয়েছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নেপাল সরকারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সহযোগিতা করছে। ভারতীয় দূতাবাস নিখোঁজ ও আটকে পড়া ভারতীয় নাগরিকদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চালাচ্ছে।

ভারত থেকে নেপালে মানবিক সহায়তা ও চিকিৎসা সামগ্রীও পাঠানো হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানিয়েছেন, ভারতীয় মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ মোকাবিলার সামগ্রী কাঠমান্ডুতে পৌঁছেছে এবং আরও সাহায্য পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।

শুধু নেপাল নয়, ভারতের দিকেও নজর

নেপালের বন্যার প্রভাব নিয়ে ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতেও সতর্কতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিহারের নদীগুলির জলস্তর এবং সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে প্রশাসন। সীমান্তবর্তী এলাকায় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল নেপালে আটকে থাকা ভারতীয় নাগরিকদের অবস্থান নিশ্চিত করা এবং সম্ভব হলে দ্রুত তাঁদের উদ্ধার করা।

মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও বদলাতে পারে

এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, নিখোঁজ ১৩৩ ভারতীয়কে মৃত ঘোষণা করা হয়নি। তাঁদের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। উদ্ধারকারী দল দুর্গম এলাকায় পৌঁছনোর পর পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হতে পারে।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তের এই ঘটনা হিমালয় অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা, হিমবাহধস ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি অঞ্চলে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা এবং পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের জন্য দ্রুত জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।

এই মুহূর্তে নেপালের মানুষের পাশাপাশি নিখোঁজ ভারতীয়দের পরিবারগুলিও অধীর অপেক্ষায় রয়েছেন—উদ্ধার অভিযানে কোনও সুখবর আসে কি না, সেই আশাতেই।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -