১৫০ বছরে ভারতে মাত্র ৫ বার, নাজফগড়ে দেখা মিলল বিরল সাইবেরিয়ান পাখির

- Advertisement -

দিল্লির নাজফগড় জলাভূমিতে দেখা মিলেছে বিরল Sharp-tailed Sandpiper পাখির। Calidris acuminata প্রজাতির এই পরিযায়ী পাখি মূলত উত্তর সাইবেরিয়ায় প্রজনন করে এবং অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে পাড়ি জমায়। ভারতে প্রায় ১৫০ বছরে এটি মাত্র পঞ্চম নথিভুক্ত রেকর্ড। জলাভূমি ধ্বংস, দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রজাতিটির অস্তিত্ব হুমকির মুখে। সাম্প্রতিক এই দেখা নাজফগড় জলাভূমির সংরক্ষণগত গুরুত্বও নতুন করে তুলে ধরেছে।

১৫০ বছরে ভারতে মাত্র ৫ বার, নাজফগড়ে দেখা মিলল বিরল সাইবেরিয়ান পাখির

ভারতের পাখিপ্রেমী ও প্রাণীবিজ্ঞানীদের মধ্যে নতুন করে তৈরি হয়েছে উৎসাহ। দিল্লি-এনসিআর এলাকার নাজফগড় জলাভূমির কাছে দেখা মিলেছে অত্যন্ত বিরল এক পরিযায়ী পাখির। নাম Sharp-tailed Sandpiper, বৈজ্ঞানিক নাম Calidris acuminata। ভারতের মাটিতে গত প্রায় দেড়শো বছরে এই প্রজাতির নথিভুক্ত উপস্থিতি হাতে গোনা কয়েকবারই পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণটি দেশে প্রজাতিটির মাত্র পঞ্চম নথিভুক্ত রেকর্ড হিসেবে সামনে এসেছে।

নাজফগড়ে কীভাবে মিলল বিরল পাখিটির সন্ধান?

আগস্টের শেষ দিকে নাজফগড় জলাভূমির চাঁদু-মাঙ্করোলা এলাকার কাছাকাছি একটি জলাভূমি ও কৃষিজমিতে পাখিটিকে দেখতে পান দিল্লি-এনসিআর-এর পাখি পর্যবেক্ষক ও সংরক্ষণকর্মী অক্ষিত দুয়া। সেখানে বেশ কিছু জলচর ও পরিযায়ী পাখির সঙ্গে খাবার খুঁজছিল অচেনা পাখিটি।

প্রথম দেখাতেই পাখিটির পালকের ধরন ও শরীরের গঠন নজর কাড়ে। পরে ছবি তুলে এবং শারীরিক বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে বিশেষজ্ঞরা সেটিকে Sharp-tailed Sandpiper হিসেবে শনাক্ত করেন। বিশেষ করে চোখের উপরের স্পষ্ট সাদা দাগ, লালচে-বাদামি মাথা এবং শরীরের পালকে আঁশের মতো নকশা প্রজাতিটি শনাক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। কাছাকাছি দেখতে অন্যান্য Sandpiper প্রজাতির সঙ্গে যাতে ভুল না হয়, সেজন্য ছবির মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।

কোথা থেকে আসে এই পাখি?

Sharp-tailed Sandpiper মূলত উত্তর সাইবেরিয়ার আর্কটিক অঞ্চলে প্রজনন করে। এর প্রজনন এলাকা লেনা নদীর বদ্বীপ থেকে কোলিমা অঞ্চলের দিকে বিস্তৃত। প্রজনন মৌসুম শেষ হলে পাখিগুলি দীর্ঘ পরিযায়ী যাত্রায় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আকাশপথ পেরিয়ে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের দিকে চলে যায়।

অর্থাৎ, ভারতের ভূখণ্ড এই পাখির প্রধান পরিযায়ী গন্তব্য নয়। সেই কারণেই দেশের কোনও জলাভূমিতে এর উপস্থিতি পাখিবিজ্ঞানীদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতের মধ্য দিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করা পরিযায়ী পাখির তুলনায় Sharp-tailed Sandpiper এখানে অত্যন্ত বিরল।

দেড়শো বছরে মাত্র পাঁচটি রেকর্ড

ভারতে এই পাখিটির উপস্থিতির ইতিহাসও বেশ চমকপ্রদ। পাখিবিজ্ঞানীদের নথি অনুযায়ী, উনিশ শতকের শেষদিকে গিলগিট অঞ্চলে প্রথম উল্লেখযোগ্য রেকর্ড পাওয়া যায়। এরপর ১৯১৫ সালে তামিলনাড়ুর ভান্দালুরে আরেকটি পাখি নথিভুক্ত হয়।

এর বহু বছর পর ২০০৪ সালে ছত্তীসগড়ে একটি সম্ভাব্য রেকর্ড সামনে আসে। এরপর ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নাজফগড় জলাভূমি এলাকাতেই ছবি-সহ Sharp-tailed Sandpiper-এর উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়েছিল। প্রায় সাত বছর পর আবার একই বৃহত্তর অঞ্চলে প্রজাতিটির দেখা মিলল। ফলে ২০২৬ সালের এই পর্যবেক্ষণকে ভারতে প্রজাতিটির পঞ্চম নথিভুক্ত রেকর্ড হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার?

একটি বিরল পাখির দেখা পাওয়া শুধু পাখিপ্রেমীদের আনন্দের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পরিবেশ ও জলাভূমির স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

নাজফগড়ের মতো জলাভূমি শহরের কাছাকাছি হওয়ায় অনেক সময় সেগুলিকে অনাবাদি বা অব্যবহৃত জমি হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবে বর্ষাকাল ও পরিযায়ী মৌসুমে এই ধরনের জলাভূমি বহু পাখির খাবার, বিশ্রাম এবং সাময়িক আশ্রয়ের জায়গা হয়ে ওঠে।

পরিবেশবিদদের মতে, নাজফগড় ও তার আশপাশের বিভিন্ন জলাভূমি ও কৃষিজমি পরিযায়ী পাখিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিরল প্রজাতির উপস্থিতি প্রমাণ করে, শহরাঞ্চলের কাছেও জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র থাকতে পারে।

বিপন্নতার মুখে প্রজাতিটি

Sharp-tailed Sandpiper-এর জন্য অবশ্য ভবিষ্যৎ খুব আশাব্যঞ্জক নয়। প্রজাতিটির সংখ্যা গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অস্ট্রেলিয়ার একটি সংরক্ষণমূলক মূল্যায়ন অনুযায়ী, প্রায় তিন প্রজন্ম বা ১৫ বছরের মধ্যে এর জনসংখ্যা আনুমানিক ৪৫ শতাংশ কমেছে।

জলাভূমি ধ্বংস ও পরিবেশের পরিবর্তন এর অন্যতম বড় কারণ। পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ পরিযায়ী পথের কিছু উপকূলীয় অঞ্চলে শিল্প, আবাসন এবং জলচাষের জন্য প্রাকৃতিক আবাসস্থল হারিয়ে যাচ্ছে। দূষণ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জলাভূমির স্বাভাবিক পরিবেশের পরিবর্তনও পাখিটির ওপর চাপ তৈরি করছে। অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরীণ জলাভূমিতে খরা ও জলাভূমির পরিমাণ কমে যাওয়াও বড় সমস্যা।

এই কারণেই আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ মূল্যায়নে Sharp-tailed Sandpiper-কে ‘Vulnerable’ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।

নাজফগড় কি পরিযায়ী পাখিদের গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা?

সাম্প্রতিক এই ঘটনা নাজফগড় জলাভূমির গুরুত্বকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। চলতি পরিযায়ী মৌসুমে এখানেই Sharp-tailed Sandpiper-এর পাশাপাশি আরও কিছু অস্বাভাবিক পরিযায়ী পাখির উপস্থিতি নজরে এসেছে বলে পাখি পর্যবেক্ষকদের দাবি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগস্ট-সেপ্টেম্বর এবং মার্চ মাসে এই অঞ্চলে পাখির আনাগোনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। বর্ষার পর সাময়িকভাবে জল জমা কৃষিজমি এবং অগভীর জলাভূমি বিভিন্ন জলচর পাখির খাবারের জায়গা হিসেবে কাজ করে।

জলাভূমি রক্ষার বার্তা

নাজফগড়ে বিরল Sharp-tailed Sandpiper-এর উপস্থিতি তাই শুধুমাত্র একটি বিরল পাখি দেখার ঘটনা নয়। এটি একই সঙ্গে একটি পরিবেশগত বার্তাও বহন করছে। শহরের সম্প্রসারণ, দূষণ ও জলাভূমির পরিবর্তনের মধ্যে এখনও যে এই অঞ্চল পরিযায়ী পাখিদের আকর্ষণ করতে পারে, তা এই ঘটনা স্পষ্ট করেছে।

বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদদের কাছে এমন প্রতিটি বিরল পাখির উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। কোন প্রজাতি কখন কোথায় আসছে, কতক্ষণ থাকছে এবং কোন পরিবেশকে খাবার ও বিশ্রামের জন্য বেছে নিচ্ছে — এই তথ্য ভবিষ্যতে পরিযায়ী পাখিদের গতিবিধি ও জলাভূমি সংরক্ষণের পরিকল্পনা তৈরিতে কাজে লাগতে পারে।

নাজফগড়ের সাম্প্রতিক এই দেখা তাই একদিকে যেমন পাখিপ্রেমীদের জন্য বিরল আনন্দের খবর, অন্যদিকে তেমনই ভারতের নগর-সংলগ্ন জলাভূমি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -