ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের ২৩–২৪ আগস্ট রাশিয়া সফরকে ঘিরে কূটনৈতিক মহলে বিশেষ নজর রয়েছে। মস্কো সফরে ভারত-রাশিয়া আন্তঃসরকারি কমিশনের বৈঠকে বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও যোগাযোগ নিয়ে আলোচনা হবে। রুশ বিদেশমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের সঙ্গেও বৈঠক করবেন জয়শঙ্কর। ইউক্রেন পরিস্থিতি-সহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ও আলোচনায় উঠে আসতে পারে।

ভারতের বিদেশমন্ত্রী ড. এস. জয়শঙ্কর দু’দিনের রাশিয়া সফরে আজ মস্কোর উদ্দেশে রওনা হচ্ছেন। ২৩ ও ২৪ আগস্টের এই সফরে ভারত-রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। রাশিয়ার প্রথম উপ-প্রধানমন্ত্রী ডেনিস মান্তুরভের আমন্ত্রণে এই সফর করছেন জয়শঙ্কর। সফরের অন্যতম প্রধান কর্মসূচি হল ভারত-রাশিয়া আন্তঃসরকারি কমিশনের ২৭তম অধিবেশনে যৌথ সভাপতিত্ব করা।
বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় বিশেষ জোর
জয়শঙ্করের রাশিয়া সফরের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভারত-রাশিয়া আন্তঃসরকারি কমিশন অন ট্রেড, ইকোনমিক, সায়েন্টিফিক, টেকনোলজিক্যাল অ্যান্ড কালচারাল কো-অপারেশন বা IRIGC-TEC। ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং সাংস্কৃতিক সহযোগিতা আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এই কমিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এবারের বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধির পাশাপাশি বাণিজ্যিক বাধা দূর করা, সরবরাহ ও পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নতি, অর্থপ্রদানের বিকল্প ব্যবস্থা এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও সহজ করার মতো বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের নথিতেও বাণিজ্যিক বাধা, লজিস্টিকস, কানেক্টিভিটি এবং পেমেন্ট মেকানিজমকে ভারত-রাশিয়া অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জ্বালানি ও কৌশলগত সম্পর্ক
ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হল জ্বালানি সহযোগিতা। ফলে জয়শঙ্করের এই সফরে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হতে পারে বলে কূটনৈতিক মহলে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ, মূল্য, পরিবহণ এবং অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের স্বার্থ বজায় রেখে রাশিয়ার সঙ্গে স্থিতিশীল অর্থনৈতিক সম্পর্ক ধরে রাখার বিষয়টি নয়াদিল্লির কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
এর পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, প্রযুক্তি এবং শিল্পক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হতে পারে। ভারত ও রাশিয়ার দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক শুধু প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়; মহাকাশ, পরমাণু শক্তি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং শিল্প সহযোগিতাতেও দুই দেশের যোগাযোগ রয়েছে।
ল্যাভরভের সঙ্গে বৈঠক
মস্কো সফরে রাশিয়ার বিদেশমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের সঙ্গেও বৈঠক করবেন জয়শঙ্কর। দুই বিদেশমন্ত্রীর আলোচনায় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয় উঠে আসতে পারে।
বিশেষ করে ইউক্রেন সংঘাত, পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন বহুপাক্ষিক মঞ্চে ভারত-রাশিয়ার সহযোগিতা নিয়ে মতবিনিময়ের সম্ভাবনা রয়েছে। ভারত বরাবরই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে কূটনৈতিক সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ফলে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনায়ও দ্বিপাক্ষিক স্বার্থের পাশাপাশি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি গুরুত্ব পেতে পারে।
গত বছরের বৈঠকের পর ফের মস্কোয় জয়শঙ্কর
এটি এক বছরের মধ্যে জয়শঙ্করের দ্বিতীয় মস্কো সফর। ২০২৫ সালের ১৯ থেকে ২১ আগস্ট তিনি রাশিয়া সফর করেছিলেন এবং IRIGC-TEC-এর ২৬তম অধিবেশনে অংশ নিয়েছিলেন। সেই সফরে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং রুশ বিদেশমন্ত্রী ল্যাভরভের সঙ্গে বৈঠকও হয়েছিল।
২০২৫ সালের ওই বৈঠকে ভারত-রাশিয়া বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। এবার সেই আলোচনার পরবর্তী ধাপ হিসেবে ২৭তম অধিবেশনে নতুন উদ্যোগ এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা হতে পারে।
পুতিনের সম্ভাব্য ভারত সফরের আগে তাৎপর্যপূর্ণ সফর
জয়শঙ্করের মস্কো সফরের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সেপ্টেম্বরে ভারতে আসার সম্ভাবনার আগে এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠক দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক প্রস্তুতিকে আরও এগিয়ে দিতে পারে। আগামী BRICS শীর্ষ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়েও আলোচনা হতে পারে বলে আন্তর্জাতিক মহলে নজর রয়েছে।
এর ফলে জয়শঙ্করের সফরকে শুধুমাত্র নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হিসেবে দেখছে না কূটনৈতিক মহলের একাংশ। বরং বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এই সফর গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
নতুন সহযোগিতার সম্ভাবনা
ভারত ও রাশিয়ার সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ হলেও বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একদিকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, অন্যদিকে বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রয়োজন — এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিস্থিতিতে জয়শঙ্করের সফরে শুধু পুরনো সহযোগিতা বজায় রাখাই নয়, নতুন ক্ষেত্রেও সম্পর্ক সম্প্রসারণের চেষ্টা হতে পারে। বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি, পরিবহণ, লজিস্টিকস, শিল্প বিনিয়োগ এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মতো ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ খোঁজা হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ২৩-২৪ আগস্টের জয়শঙ্করের রাশিয়া সফর ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ একটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ। IRIGC-TEC-এর বৈঠক এবং ল্যাভরভের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে নিজেদের কৌশলগত অংশীদারিত্বকে কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবে, সেই দিকেও নজর থাকবে।

