কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বিজ্ঞপ্তির পর কেরলের সরকারি নাম বদলে ‘কেরালাম’ (Keralam) হয়েছে। ২০২৪ সালে কেরল বিধানসভায় নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। পরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অনুমোদন, লোকসভা ও রাজ্যসভায় বিল পাস এবং রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর আইনটি কার্যকর হয়। ২৫ আগস্ট ২০২৬ থেকে সরকারি নথি ও সাংবিধানিক ব্যবহারে ‘Keralam’ নাম কার্যকর হয়েছে।

দীর্ঘদিনের দাবি ও একাধিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার পর অবশেষে সরকারি ভাবে বদলে গেল কেরলের নাম। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, দেশের দক্ষিণের এই রাজ্যের সরকারি নাম এখন থেকে ‘কেরালাম’ (Keralam)। মালয়ালম ভাষায় রাজ্যটির প্রচলিত নাম ‘কেরালাম’ হলেও এতদিন ইংরেজি সরকারি নথিতে রাজ্যের নাম ছিল ‘Kerala’। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে সরকারি ব্যবহারে সেই নামের পরিবর্তন ঘটল।
রাজ্যের নাম পরিবর্তনের এই উদ্যোগ একদিনে হয়নি। এর পিছনে রয়েছে কয়েক বছরের প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। কেরল বিধানসভায় নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব গ্রহণ থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অনুমোদন, সংসদে বিল পাস এবং রাষ্ট্রপতির সম্মতি — একাধিক ধাপ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত তা আইনে পরিণত হয়েছে।
বিধানসভায় প্রস্তাব থেকেই শুরু
কেরলের নাম পরিবর্তনের দাবি মূলত রাজ্যের নিজস্ব ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে সরকারি নামকে সামঞ্জস্য করার বিষয়টির সঙ্গে যুক্ত। ২০২৪ সালের ২৪ জুন কেরল বিধানসভায় রাজ্যের নাম ‘Kerala’ থেকে ‘Keralam’ করার প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করা হয়।
রাজ্য সরকারের বক্তব্য ছিল, মালয়ালম ভাষায় রাজ্যটির নাম দীর্ঘদিন ধরেই ‘കേരളം’ বা ‘Keralam’। তাই সংবিধান এবং কেন্দ্রীয় সরকারি নথিতে ব্যবহৃত নামের সঙ্গেও স্থানীয় নামের সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। বিধানসভার প্রস্তাবের পর বিষয়টি কেন্দ্রের কাছে পাঠানো হয়।
এরপর কেন্দ্রীয় স্তরে শুরু হয় প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও আইনি প্রক্রিয়া। নাম পরিবর্তনের মতো বিষয়ে শুধু রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তই যথেষ্ট নয়; সংবিধান এবং কেন্দ্রীয় আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অনুমোদন
দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর ২০২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা কেরলের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবে অনুমোদন দেয়। এরপর বিষয়টি সংসদে বিল আকারে পেশ করার পথ তৈরি হয়।
নাম পরিবর্তনের জন্য আনা হয় Kerala (Alteration of Name) Bill, 2026। এই বিলের উদ্দেশ্য ছিল সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট সরকারি নথিতে ‘Kerala’-এর পরিবর্তে ‘Keralam’ নাম ব্যবহারের আইনি ভিত্তি তৈরি করা।
সংসদে বিলটি নিয়ে আলোচনা হয় এবং শেষ পর্যন্ত দুই কক্ষেই তা পাস হয়। ১১ আগস্ট লোকসভা এবং ১২ আগস্ট রাজ্যসভায় বিলটি অনুমোদিত হয়। সংসদের দুই কক্ষে অনুমোদনের পর বিলটি রাষ্ট্রপতির সম্মতির জন্য পাঠানো হয়।
রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর আইনে পরিণত
সংসদে বিল পাস হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সম্মতি পাওয়ার মাধ্যমে নাম পরিবর্তনের আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়। এরপর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক প্রয়োজনীয় গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২৫ আগস্ট ২০২৬ থেকে সংশ্লিষ্ট আইন কার্যকর হয়েছে। অর্থাৎ ওই তারিখ থেকেই সরকারি ভাবে ‘Kerala’-এর পরিবর্তে ‘Keralam’ নাম কার্যকর বলে গণ্য হচ্ছে।
এর ফলে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন সরকারি নথি, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং সাংবিধানিক উল্লেখে নতুন নাম ব্যবহারের প্রক্রিয়া শুরু হবে। ধীরে ধীরে বিভিন্ন সরকারি রেকর্ড, ওয়েবসাইট, ফর্ম এবং প্রশাসনিক নথিতেও ‘Keralam’ নাম প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কেন ‘Keralam’ নাম?
‘Keralam’ কোনও নতুন নাম নয়। এটি মালয়ালম ভাষায় রাজ্যটির নিজস্ব ও বহুল প্রচলিত নাম। স্থানীয় ভাষায় রাজ্যটিকে ‘കേരളം’ বলা হয়, যার ইংরেজি রূপান্তর ‘Keralam’।
নাম পরিবর্তনের সমর্থকদের যুক্তি, একটি রাজ্যের সরকারি নাম তার ভাষা, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। সেই দিক থেকে ‘Keralam’ নামটি রাজ্যের স্থানীয় পরিচয়কে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ‘Kerala’ নামটি সম্পূর্ণ অচল হয়ে যাবে এমন নয়। সাধারণ কথাবার্তা, আন্তর্জাতিক পরিচিতি, সংবাদমাধ্যম বা পুরনো নথিতে ‘Kerala’ শব্দটি দীর্ঘদিন ব্যবহৃত হতে পারে। তবে নতুন সরকারি আইনি কাঠামোয় রাজ্যের নাম হবে ‘Keralam’।
সংবিধানেও পরিবর্তনের প্রভাব
নাম পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির একটি হল এর সাংবিধানিক প্রভাব। শুধুমাত্র রাজ্য সরকারের নথিতে নাম পরিবর্তন করলেই বিষয়টি সম্পূর্ণ হয় না। ভারতের সংবিধানের সংশ্লিষ্ট জায়গাতেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হয়।
২০২৬ সালের আইন সেই সাংবিধানিক ও আইনি পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছে। ফলে ভবিষ্যতে কেন্দ্রীয় সরকারি নথি ও সাংবিধানিক উল্লেখে ‘Keralam’ নাম ব্যবহারের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
কেরলের জন্য নতুন পরিচয়ের অধ্যায়
একটি রাজ্যের নাম পরিবর্তন প্রশাসনিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর সঙ্গে আবেগ ও পরিচয়ের বিষয়টিও জড়িয়ে থাকে। কেরলের ক্ষেত্রে ‘Keralam’ নামটি স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই নাম পরিবর্তনকে অনেকেই রাজ্যের নিজস্ব ঐতিহ্যকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
তবে নাম পরিবর্তনের পর বাস্তব প্রশাসনিক ক্ষেত্রে কিছুটা সময় লাগতে পারে। বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারি দফতর, নথি, অনলাইন পোর্টাল, মানচিত্র, পরিচয়পত্র এবং অন্যান্য সরকারি ব্যবস্থায় পুরনো নামের পরিবর্তে নতুন নাম ব্যবহারের জন্য পর্যায়ক্রমে আপডেট প্রয়োজন হবে।
সব মিলিয়ে, ২৫ আগস্ট ২০২৬ থেকে কেরলের সরকারি নাম ‘Keralam’ হওয়া দেশের রাজ্যগুলির নামকরণের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। মালয়ালম ভাষায় বহুদিন ধরে প্রচলিত নাম এবার ভারতের সরকারি ও সাংবিধানিক ব্যবস্থাতেও জায়গা পেল। দীর্ঘ প্রশাসনিক ও আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার শেষে কেরল প্রবেশ করল তার নতুন সরকারি নামের অধ্যায়ে।
নাম পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্তের ফলে রাজ্যের ভৌগোলিক অবস্থান, প্রশাসনিক কাঠামো বা রাজ্যের অধিকার ও দায়িত্বে কোনও পরিবর্তন হচ্ছে না। মূল পরিবর্তনটি হল রাজ্যের সরকারি নামের ক্ষেত্রে — ‘Kerala’-এর পরিবর্তে এখন থেকে ব্যবহৃত হবে ‘Keralam’।

