নয়াদিল্লিতে শুরু হয়েছে SEMICON India 2026। তিন দিনের এই সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সেমিকন্ডাক্টর সংস্থা, বিনিয়োগকারী ও প্রযুক্তিবিদরা অংশ নিচ্ছেন। Applied Materials ভারতে আগামী এক দশকে ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা জানিয়েছে। Tata Electronics ও Nexperia-র অংশীদারিত্বও গুরুত্বপূর্ণ। Semicon 2.0-এ ₹১.২৭ লক্ষ কোটি বরাদ্দের মাধ্যমে চিপ ডিজাইন, উৎপাদন, প্যাকেজিং, গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে জোর দিচ্ছে ভারত।

নয়াদিল্লির যশোভূমিতে বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর শুরু হল SEMICON India 2026। তিন দিনের এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন চলবে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এবারের মূল স্লোগান — “Silicon to Systems: Building the Ecosystem”। ভারতের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে শুধুমাত্র চিপ উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ডিজাইন, উৎপাদন, প্যাকেজিং, যন্ত্রপাতি, গবেষণা এবং দক্ষ মানব সম্পদ — সবকিছুকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যই এবারের সম্মেলনের অন্যতম মূল বিষয়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, SEMICON India 2026-এ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ৬০০-র বেশি প্রদর্শক, ৩০০-র বেশি আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং ৪০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন। সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বড় সংস্থা, বিনিয়োগকারী, প্রযুক্তিবিদ, গবেষক, সরকারি আধিকারিক এবং শিক্ষাক্ষেত্রের প্রতিনিধিদের নিয়ে এই সম্মেলনকে ভারতের চিপ-শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর?
স্মার্টফোন থেকে গাড়ি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে ডেটা সেন্টার, টেলিকম থেকে প্রতিরক্ষা — আধুনিক প্রযুক্তির প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই সেমিকন্ডাক্টরের প্রয়োজন। AI, 5G ও 6G, বৈদ্যুতিক গাড়ি, Internet of Things এবং উন্নত শিল্প প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে চিপের চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। ফলে চিপের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা এখন শুধুমাত্র শিল্পনীতির বিষয় নয়; এটি প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং সরবরাহ-নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
এই পরিস্থিতিতে ভারত দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ শৃঙ্খলে নিজের জায়গা তৈরি করতে চাইছে। সরকারি নীতির লক্ষ্য হল বিদেশ থেকে সম্পূর্ণ নির্ভরতার বদলে দেশের মধ্যেই চিপের ডিজাইন, উৎপাদন, প্যাকেজিং এবং প্রয়োজনীয় উপকরণের একটি বিস্তৃত পরিকাঠামো তৈরি করা।
বড় বিনিয়োগের ঘোষণা Applied Materials-এর
SEMICON India 2026 শুরুর দিনেই সেমিকন্ডাক্টর যন্ত্রপাতি নির্মাতা মার্কিন সংস্থা Applied Materials ভারতে আগামী এক দশকে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। গবেষণা, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং দক্ষ কর্মী তৈরির ক্ষেত্রে এই বিনিয়োগ ব্যবহার করার কথা রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে AI-এর কারণে চিপের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বিভিন্ন সংস্থাকে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের বাজার ও উৎপাদন পরিকাঠামো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
Tata Electronics ও Nexperia-র অংশীদারিত্ব
সম্মেলনের দিনেই আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘোষণা এসেছে। নেদারল্যান্ডসের Nexperia এবং ভারতের Tata Electronics ভারতে সেমিকন্ডাক্টর চিপ উৎপাদন ও প্যাকেজিংয়ের জন্য কৌশলগত অংশীদারিত্বের কথা জানিয়েছে।
এই সহযোগিতার আওতায় গুজরাটের ধোলেরায় Tata Electronics-এর উৎপাদন পরিকাঠামোতে Nexperia-র পাওয়ার কন্ট্রোল চিপ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি অসমের জাগিরোডে Tata-র সেমিকন্ডাক্টর প্যাকেজিং ইউনিটে চিপ পরীক্ষা ও অ্যাসেম্বলির কাজও হওয়ার কথা।
এই ধরনের অংশীদারিত্ব ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে শুধু fab তৈরি করলেই হয় না। চিপ পরীক্ষা, প্যাকেজিং, উপকরণ, যন্ত্রপাতি এবং supply chain-এর অন্যান্য ধাপও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
Semicon 2.0-এ ₹১.২৭ লক্ষ কোটি
ভারতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল Semicon 2.0। ২০২৬ সালের ১৫ জুলাই কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা এই কর্মসূচিতে ₹১,২৭,৫০০ কোটি বরাদ্দ অনুমোদন করেছে। এই প্রকল্পের অধীনে ছয়টি প্রধান ক্ষেত্রে জোর দেওয়া হয়েছে — চিপ ডিজাইন, সেমিকন্ডাক্টর যন্ত্রপাতি ও উপকরণ, নতুন fabrication unit বা fab, advanced packaging, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি।
সরকারের হিসাবে, Semicon 1.0-এর অধীনে এখনও পর্যন্ত ১২টি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে, যার মোট বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি ₹১.৬৪ লক্ষ কোটির বেশি। এর মধ্যে তিনটি প্রকল্প ইতিমধ্যেই বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করেছে।
Micron, Kaynes এবং CG Semi-র প্রকল্পগুলিতে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর বিষয়টি ভারতের সেমিকন্ডাক্টর যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। আরও একটি প্রকল্প ২০২৬ সালেই কার্যক্রম শুরু করার পর্যায়ে রয়েছে বলে সরকারি তথ্য জানিয়েছে।
শুধু কারখানা নয়, তৈরি হচ্ছে পুরো ecosystem
ভারতের সেমিকন্ডাক্টর পরিকল্পনায় এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে সম্পূর্ণ ecosystem তৈরি করা। অর্থাৎ বিদেশি সংস্থার হয়ে শুধু চিপ assemble বা package করার পরিবর্তে দেশে chip design, fabrication, testing, packaging, semiconductor materials, gases, equipment, research এবং skilled workforce — সব ক্ষেত্রের সক্ষমতা তৈরি করার চেষ্টা চলছে।
সরকারের মতে, এর মাধ্যমে domestic value addition বাড়ানোর পাশাপাশি supply chain আরও স্থিতিশীল করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে অটোমোবাইল, টেলিকম, aerospace, power electronics এবং consumer electronics-এর মতো শিল্পে প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের দেশীয় সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সামনে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ
তবে সেমিকন্ডাক্টর ক্ষেত্রে ভারতের যাত্রা এখনও নির্মাণের পর্যায়ে। Reuters-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহৎ আকারের fabrication facility থেকে ভারতে এখনও chip উৎপাদন শুরু হয়নি। Tata Electronics-এর গুজরাটের প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের fab প্রকল্পের সময়সূচিতে প্রায় দুই বছরের বিলম্ব হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ বিনিয়োগ, প্রকল্প অনুমোদন এবং অংশীদারিত্বের পাশাপাশি বাস্তবে কত দ্রুত উৎপাদন ক্ষমতা তৈরি করা যায়, সেটিই আগামী দিনের বড় প্রশ্ন। দক্ষ কর্মী, উন্নত যন্ত্রপাতি, অত্যন্ত নির্ভুল উৎপাদন প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক supply chain-এর সঙ্গে সমন্বয়—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি কাজ প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে SEMICON India 2026 ভারতের সেমিকন্ডাক্টর পরিকল্পনাকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠেছে। নতুন বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব এবং Semicon 2.0-এর বৃহৎ আর্থিক সহায়তা দেখাচ্ছে যে ভারত চিপ শিল্পে নিজের সক্ষমতা বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। এখন নজর থাকবে ঘোষিত প্রকল্পগুলি কত দ্রুত বাস্তব উৎপাদন, রপ্তানি এবং বৃহত্তর প্রযুক্তি-শিল্পের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে তার ওপর।

