দিল্লিতে শুরু BRICS সম্মেলন, গোটা বিশ্ব রাজনীতির নজর এখন ভারতের দিকে

- Advertisement -

নয়াদিল্লিতে আজ থেকে শুরু হচ্ছে ১৮তম BRICS শীর্ষ সম্মেলন। ভারতের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই বৈঠকে বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হবে। রাশিয়া, চিন, ইরান-সহ সদস্য দেশগুলির শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে সম্মেলন ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে আগ্রহ তুঙ্গে। মোদী-পুতিন ও মোদী-শি বৈঠকেও নজর রয়েছে। Global South-এর স্বার্থ জোরদার করাই ভারতের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

দিল্লিতে শুরু BRICS সম্মেলন, গোটা বিশ্ব রাজনীতির নজর এখন ভারতের দিকে
Symbolic Image By AI

আজ থেকে নয়াদিল্লিতে শুরু হচ্ছে ১৮তম BRICS শীর্ষ সম্মেলন। ভারতীয় সভাপতিত্বে ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ভারত মণ্ডপমে বসছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদীয়মান অর্থনীতির জোটের এই বৈঠক। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান-সহ একাধিক রাষ্ট্রনেতা ও শীর্ষ প্রতিনিধির উপস্থিতিতে এবারের সম্মেলন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

ভারতের নেতৃত্বে এবারের BRICS সম্মেলনের মূল লক্ষ্য শুধু সদস্য দেশগুলির মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো নয়। বিশ্বব্যাপী পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, বাণিজ্যিক বাধা, জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলির সংস্কার এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির বৃহত্তর ভূমিকা—সবকিছু নিয়েই আলোচনা হওয়ার কথা। ভারতের ২০২৬ সালের BRICS সভাপতিত্বের মূল ভাবনা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে “Building for Resilience, Innovation, Cooperation and Sustainability” — অর্থাৎ স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও স্থায়িত্বের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ নির্মাণ।

বিশ্বের নজরে ভারত

BRICS-এর পরিধি গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মূলত ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চিনকে নিয়ে শুরু হওয়া এই গোষ্ঠীতে পরে দক্ষিণ আফ্রিকা যুক্ত হয়। সাম্প্রতিক সম্প্রসারণের ফলে মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, সৌদি আরব ও ইন্দোনেশিয়াও জোটের সদস্য হয়েছে। ফলে বিশ্বের জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও কৌশলগত সম্পদের একটি বড় অংশ এখন এই গোষ্ঠীর আওতায় রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে দিল্লির সম্মেলনকে শুধু একটি আন্তর্জাতিক বৈঠক হিসেবে দেখছে না কূটনৈতিক মহল। বিশ্ব রাজনীতিতে বহুমেরু ব্যবস্থার প্রসার, উন্নয়নশীল দেশগুলির স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার ভারসাম্য — এই বৃহত্তর প্রশ্নগুলির ক্ষেত্রেও এবারের বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

যুদ্ধ ও ভূরাজনীতি বড় আলোচনার বিষয়

এবারের BRICS সম্মেলন এমন সময়ে হচ্ছে, যখন ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে অস্থির করে রেখেছে। যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে জ্বালানি সরবরাহ, সমুদ্রপথ, বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক বাজারে। ফলে সদস্য দেশগুলির মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও সংঘাতের প্রভাব কমানো এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।

ভারতের অবস্থান বরাবরই আলোচনার মাধ্যমে সংঘাতের সমাধানের পক্ষে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও আন্তর্জাতিক সংঘাতের ক্ষেত্রে সংলাপ ও কূটনীতির গুরুত্বের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ইউক্রেন ও পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি কীভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করছে, সেটিও আলোচনায় এসেছে।

মোদী-পুতিন বৈঠক ঘিরে বাড়তি আগ্রহ

সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠক বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ভারত-রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

পুতিনের সফরকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহও যথেষ্ট। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে রাশিয়া BRICS-এর মতো অ-পশ্চিমা মঞ্চকে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে ভারত রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি আমেরিকা ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলির সঙ্গেও কৌশলগত সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করছে। ফলে দিল্লির সম্মেলনে ভারতের কূটনৈতিক ভারসাম্যের নীতিও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

মোদী-শি বৈঠকেও থাকবে নজর

এবারের সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হতে পারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক। দুই দেশের সম্পর্কের নানা জটিলতার মধ্যেও সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও চিনের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা হয়েছে। চিনের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক জোরদার করার জন্য যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে বেইজিং আগ্রহী।

BRICS-এর মঞ্চে ভারত ও চিনের সম্পর্ক তাই আলাদা গুরুত্ব বহন করছে। সীমান্ত-সংক্রান্ত মতপার্থক্য, বাণিজ্য এবং সরবরাহ-শৃঙ্খলের পাশাপাশি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হতে পারে। তবে কোনও বড় সিদ্ধান্তের বদলে রাজনৈতিক যোগাযোগ ও পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ানোর দিকেই বেশি গুরুত্ব থাকতে পারে বলে মনে করছে কূটনৈতিক মহল।

অর্থনীতি ও বিকল্প বাণিজ্যব্যবস্থা

BRICS-এর আলোচনায় অর্থনৈতিক সহযোগিতা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। এবারের সম্মেলনেও সদস্য দেশগুলির মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে।

সম্প্রতি BRICS Business Forum-এ প্রধানমন্ত্রী মোদী ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতির অগ্রগতি তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, UPI ভারতের ডিজিটাল রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন BRICS দেশগুলির মধ্যে প্রযুক্তি, পরিকাঠামো, পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান BRICS সদস্য দেশগুলির মধ্যে জাতীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে সদস্য দেশগুলির অর্থনৈতিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক স্বার্থের পার্থক্যের কারণে একটি অভিন্ন বিকল্প আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলা সহজ হবে না বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দিল্লিতে ব্যাপক প্রস্তুতি

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাষ্ট্রনেতা ও প্রতিনিধিদের আগমনকে কেন্দ্র করে নয়াদিল্লিতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দর থেকে গুরুত্বপূর্ণ হোটেল এবং সম্মেলনস্থল ভারত মণ্ডপম পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা ও এলাকা সাজিয়ে তোলা হয়েছে। বিভিন্ন মোড়ে BRICS-ভিত্তিক আলোকসজ্জা, LED সাইনেজ ও অন্যান্য সৌন্দর্যায়নের কাজ করা হয়েছে। শহরের বিভিন্ন অংশে প্রায় ১৫ হাজার গাছ লাগানো হয়েছে বলেও জানা গেছে।

নিরাপত্তার পাশাপাশি যান চলাচল নিয়েও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শীর্ষ সম্মেলনের দিনগুলিতে দিল্লির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় নিয়ন্ত্রিত যান চলাচল, ডাইভারশন এবং বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা রাখা হয়েছে।

ভারতের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ এই সম্মেলন?

ভারতের কাছে এবারের BRICS সম্মেলন একাধিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বিশ্বের অন্যতম বড় বহুপাক্ষিক মঞ্চে ভারতের নেতৃত্ব প্রদর্শনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, Global South বা উন্নয়নশীল দেশগুলির স্বার্থকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে আনার চেষ্টা করতে পারবে নয়াদিল্লি।

একই সঙ্গে ভারত চাইছে BRICS-কে শুধুমাত্র পশ্চিমবিরোধী রাজনৈতিক জোট হিসেবে নয়, বরং বাস্তব অর্থনৈতিক সহযোগিতা, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং উন্নয়নমূলক অংশীদারিত্বের একটি কার্যকর মঞ্চ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে।

দুই দিনের সম্মেলনের শেষে একটি যৌথ ঘোষণাপত্র বা New Delhi Declaration গৃহীত হওয়ার কথা। সেখানে আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থার সংস্কার, বহুপাক্ষিকতার শক্তিশালীকরণ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বিভিন্ন বৈশ্বিক সংকট নিয়ে সদস্য দেশগুলির অভিন্ন অবস্থানের প্রতিফলন থাকতে পারে।

সব মিলিয়ে, দিল্লির BRICS সম্মেলন ভারতের জন্য শুধু একটি আন্তর্জাতিক আয়োজন নয়; এটি দেশের কূটনৈতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং Global South-এর নেতৃত্বের দাবিকে আরও জোরালো করার একটি বড় সুযোগ। যুদ্ধ, বাণিজ্য-সংঘাত ও বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তার মধ্যে সদস্য দেশগুলি কতটা বাস্তবসম্মত ঐকমত্যে পৌঁছতে পারে, এখন সেদিকেই নজর গোটা বিশ্বের।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -