ভারতে বাড়ছে সৌরবিদ্যুৎ, তবু নষ্ট হচ্ছে বিপুল শক্তি! সমস্যার মূলে আসলে কী?

- Advertisement -

ভারতে দ্রুত বাড়ছে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও প্রকল্পের সংখ্যা। কিন্তু ট্রান্সমিশন পরিকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, গ্রিডের ভারসাম্য রক্ষা এবং পর্যাপ্ত ব্যাটারি স্টোরেজের অভাবে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুনে প্রায় ৮,১৩৩ GWh সৌরবিদ্যুৎ কমিয়ে দিতে হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে সৌরশক্তির পূর্ণ সুবিধা পেতে ট্রান্সমিশন, গ্রিড ও শক্তি সঞ্চয় ব্যবস্থায় দ্রুত বিনিয়োগ জরুরি।

ভারতে বাড়ছে সৌরবিদ্যুৎ, তবু নষ্ট হচ্ছে বিপুল শক্তি! সমস্যার মূলে আসলে কী?

ভারতে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। দেশজুড়ে একের পর এক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু হচ্ছে এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রে ভারত ক্রমশ বড় শক্তি হিসেবে উঠে আসছে। কিন্তু এই সাফল্যের মধ্যেই সামনে এসেছে নতুন একটি সমস্যা। উৎপাদিত সৌর বিদ্যুতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সবসময় গ্রিডে নেওয়া বা ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিপুল পরিমাণ পরিষ্কার জ্বালানি কার্যত অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন — এই তিন মাসে ভারতে প্রায় ৮,১৩৩ গিগাওয়াট-ঘণ্টা (GWh) সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দিতে হয়েছে। মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বিদ্যুৎ পরিবহণের পরিকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং গ্রিডের নিরাপত্তা বজায় রাখার প্রয়োজন।

তিন মাসে ৮,১৩৩ GWh সৌর বিদ্যুৎ কমানো হয়েছে

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে প্রায় ২,৪১৭ GWh, মে মাসে ৩,২৩৫ GWh এবং জুন মাসে আরও ২,৪৮১ GWh সৌর বিদ্যুৎ গ্রিডে নেওয়া সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে মোট ৮,১৩৩ GWh সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন সীমিত করতে হয়েছে।

এই ঘটনাকে বিদ্যুৎ খাতে ‘Solar Curtailment’ বলা হয়। অর্থাৎ সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম হলেও গ্রিডের পরিস্থিতির কারণে সেই উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া বা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ দেশের বিদ্যুতের চাহিদা যখন দ্রুত বাড়ছে, তখন উৎপাদিত পরিষ্কার শক্তি পুরোপুরি কাজে লাগাতে না পারা অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত — দুই দিক থেকেই বড় চ্যালেঞ্জ।

আসল সমস্যা কোথায়?

ভারতের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের বড় অংশ তৈরি হচ্ছে এমন এলাকায় যেখানে প্রচুর সূর্যালোক পাওয়া যায়। গুজরাট ও রাজস্থানের মতো রাজ্যে বৃহৎ সৌর প্রকল্প গড়ে উঠেছে। কিন্তু সেখানে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দেশের অন্যান্য প্রান্তে পৌঁছে দিতে প্রয়োজন শক্তিশালী উচ্চক্ষমতার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক।

সমস্যা হচ্ছে, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরির গতি অনেক ক্ষেত্রে ট্রান্সমিশন পরিকাঠামো তৈরির গতির চেয়ে বেশি। ফলে কোথাও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হয়ে গেলেও সেই বিদ্যুৎ বহন করার জন্য প্রয়োজনীয় লাইন বা গ্রিড পরিকাঠামো পুরোপুরি প্রস্তুত থাকছে না।

ভারতের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বর্তমানে এমন বেশ কিছু প্রকল্প রয়েছে যেগুলি অস্থায়ী গ্রিড সংযোগের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্কে চাপ তৈরি হলে এই ধরনের প্রকল্পের বিদ্যুৎ উৎপাদন সীমিত করার প্রয়োজন পড়তে পারে।

দুপুরে সবচেয়ে বেশি সমস্যা

সৌর বিদ্যুতের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হল — দিনের নির্দিষ্ট সময়ে উৎপাদন হঠাৎ বেড়ে যায়। বিশেষ করে দুপুরে সূর্যের আলো তীব্র থাকলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।

কিন্তু একই সময়ে গ্রিডে বিদ্যুতের চাহিদা সবসময় সেই হারে বাড়ে না। ফলে উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে যায়। গ্রিডের স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য তখন কিছু সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

এখানে আরও একটি সমস্যা রয়েছে — ভারতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ এখনও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। এই কেন্দ্রগুলিকে সবসময় দ্রুত বন্ধ বা চালু করা সম্ভব নয়। ফলে সৌরবিদ্যুৎ হঠাৎ বেড়ে গেলে গ্রিড পরিচালকদের সামনে ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়।

ব্যাটারি স্টোরেজ কি সমাধান হতে পারে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌরবিদ্যুতের এই সমস্যা মোকাবিলায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হতে পারে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ। দুপুরে যখন সৌরবিদ্যুৎ বেশি উৎপাদন হবে, তখন অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে জমিয়ে রাখা যেতে পারে। পরে সন্ধ্যা বা রাতে যখন সৌর উৎপাদন কমে যায় কিন্তু বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে, তখন সেই সঞ্চিত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব।

তবে ভারতের বর্তমান ব্যাটারি স্টোরেজ ক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় এখনও সীমিত। ফলে ভবিষ্যতে সৌর ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য শক্তির দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বড় আকারে শক্তি সঞ্চয় ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও ট্রান্সমিশন এবং স্টোরেজ—দুই ক্ষেত্রেই দ্রুত বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে।

সৌর বিদ্যুতে ভারতের অগ্রগতি কিন্তু থেমে নেই

সমস্যা থাকলেও ভারতের সৌরবিদ্যুৎ খাতে সম্প্রসারণের গতি যথেষ্ট দ্রুত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৩১ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত ভারতের মোট ইনস্টল করা সৌরবিদ্যুৎ ক্ষমতা ১৬৪.৫৯ GW-এ পৌঁছেছে। এর মধ্যে গ্রাউন্ড-মাউন্টেড সৌর প্রকল্প, রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ, হাইব্রিড প্রকল্প এবং অফ-গ্রিড সৌর ব্যবস্থাও রয়েছে।

অর্থাৎ ভারতের সামনে এখন শুধু আরও সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করার লক্ষ্য নয়। উৎপাদিত বিদ্যুৎ যাতে নির্ভরযোগ্যভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছানো যায় এবং প্রয়োজনের সময়ে ব্যবহার করা যায়, সেই পরিকাঠামো তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

২০৩০ সালের লক্ষ্য সামনে

ভারত ২০৩০ সালের মধ্যে বিপুল পরিমাণ অ-জীবাশ্ম জ্বালানি ভিত্তিক বিদ্যুৎ ক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েছে। সেই লক্ষ্যে সৌরবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি যদি ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক, গ্রিড নমনীয়তা এবং শক্তি সঞ্চয় ব্যবস্থা একই গতিতে না বাড়ে, তাহলে ভবিষ্যতে সৌরবিদ্যুৎ ‘কার্টেইলমেন্ট’-এর সমস্যা আরও বড় হতে পারে।

তাই ভারতের বিদ্যুৎ খাতে এখন নতুন প্রশ্ন শুধু “কত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে?” নয়। বরং প্রশ্ন হচ্ছে — “উৎপাদিত সৌরবিদ্যুতের কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাবে?”

দেশের পরিষ্কার জ্বালানির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার ওপর। দ্রুত ট্রান্সমিশন পরিকাঠামো তৈরি, ব্যাটারি স্টোরেজ বাড়ানো এবং আরও নমনীয় গ্রিড ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে ভারতের সৌরবিদ্যুৎ বিপ্লব আরও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -