AI-এর দাপটে বদলে যাচ্ছে ভারতের ডেটা সেন্টার : বিদ্যুৎ ও কুলিংয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

- Advertisement -

ভারতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত প্রসারের ফলে ডেটা সেন্টার শিল্পে বড় পরিবর্তন আসছে। AI সার্ভারের জন্য বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা, পাশাপাশি প্রয়োজন হচ্ছে উন্নত কুলিং প্রযুক্তির। লিকুইড কুলিংয়ের ব্যবহারও বাড়ছে। মুম্বই, দিল্লি, বেঙ্গালুরুর পাশাপাশি নতুন শহর ও রাজ্যে ডেটা সেন্টার বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ, জল, পরিবেশ ও পরিকাঠামোর চাপ সামলানোই আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ।

AI-এর দাপটে বদলে যাচ্ছে ভারতের ডেটা সেন্টার : বিদ্যুৎ ও কুলিংয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর দ্রুত প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ভারতে তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের প্রযুক্তিগত চাহিদা। শুধু উন্নত চিপ, সফটওয়্যার বা ক্লাউড পরিষেবা নয় — AI-এর পিছনে থাকা ডেটা সেন্টারগুলির জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে বিদ্যুৎ, কুলিং এবং পরিকাঠামো। সাম্প্রতিক শিল্প-তথ্য বলছে, আগামী কয়েক বছরে ভারতের ডেটা সেন্টার শিল্পে বিপুল সম্প্রসারণ হতে চলেছে এবং তার সঙ্গে বাড়বে বিদ্যুতের চাহিদাও।

AI মডেল প্রশিক্ষণ এবং বিপুল পরিমাণ AI-ভিত্তিক পরিষেবা চালাতে যে কম্পিউটিং ক্ষমতা প্রয়োজন, তা সাধারণ ডেটা সেন্টারের তুলনায় অনেক বেশি। বিশেষ করে GPU-নির্ভর সার্ভারগুলি অত্যন্ত বেশি বিদ্যুৎ খরচ করে এবং একই সঙ্গে প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে। ফলে পুরনো ধরনের এয়ার-কুলিং ব্যবস্থা দিয়ে ভবিষ্যতের AI ডেটা সেন্টারের চাহিদা সামলানো কঠিন হয়ে উঠছে।

বিদ্যুতের চাহিদায় বড় বৃদ্ধি

ভারতের বিদ্যুৎ মন্ত্রকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩১-৩২ সালের মধ্যে দেশের ডেটা সেন্টারগুলির জন্য অতিরিক্ত প্রায় ২৬.৩ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদা তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে প্রায় ১৭ গিগাওয়াটের জন্য ইতিমধ্যেই বিভিন্ন রাজ্যের ট্রান্সমিশন সংস্থার কাছে সংযোগের আবেদন জমা পড়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, AI-এর প্রসার কেবল প্রযুক্তি সংস্থাগুলির ব্যবসায়িক হিসাব বদলাচ্ছে না, দেশের বিদ্যুৎ পরিকাঠামোর উপরও নতুন চাপ তৈরি করছে।

বর্তমানে ভারতের ডেটা সেন্টার ক্ষমতা ২০২০ সালের প্রায় ৩৭৫ মেগাওয়াট থেকে ২০২৫ সালে প্রায় ১,৫০০ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। AI এবং ক্লাউড পরিষেবার ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে এই ক্ষমতা আরও দ্রুত বাড়বে বলে শিল্পমহলের অনুমান।

কুলিং প্রযুক্তিতে পরিবর্তন

AI সার্ভারের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলির একটি হল অতিরিক্ত তাপ। উচ্চক্ষমতার GPU একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ গণনা চালানোর সময় প্রচলিত সার্ভারের তুলনায় অনেক বেশি তাপ তৈরি করে। তাই ডেটা সেন্টারে তাপ নিয়ন্ত্রণ এখন আর শুধুমাত্র এয়ার কন্ডিশনিংয়ের বিষয় নয়; এটি পরিকাঠামো পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।

এই পরিস্থিতিতে লিকুইড কুলিং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। এই পদ্ধতিতে তরলের মাধ্যমে সরাসরি সার্ভার বা চিপ থেকে তাপ সরিয়ে নেওয়া হয়। উচ্চ ঘনত্বের AI সার্ভার সম্বলিত ডেটা সেন্টারে এই প্রযুক্তি তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর হতে পারে।

শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের AI ডেটা সেন্টারে প্রতি র‌্যাকের বিদ্যুৎ চাহিদা প্রচলিত ব্যবস্থার তুলনায় কয়েক গুণ বাড়তে পারে। ফলে একই জায়গায় বেশি কম্পিউটিং ক্ষমতা বসাতে গেলে বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং তাপ নিয়ন্ত্রণ — দুই ক্ষেত্রেই নতুন নকশা প্রয়োজন হবে।

শুধু বিদ্যুৎ নয়, জলও গুরুত্বপূর্ণ

ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণের সঙ্গে পরিবেশগত উদ্বেগও বাড়ছে। কুলিংয়ের জন্য ব্যবহৃত প্রযুক্তির উপর নির্ভর করে জল ব্যবহারের পরিমাণ পরিবর্তিত হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ডেটা সেন্টারের জল ব্যবহারের পরিমাণ নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট কুলিং প্রযুক্তির ধরনের উপর। শিল্পক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ জল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নিয়মকানুন রয়েছে।

এই কারণেই ভবিষ্যতের ডেটা সেন্টার তৈরির ক্ষেত্রে বিদ্যুতের পাশাপাশি জলসম্পদ এবং পরিবেশগত প্রভাবকেও গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও জলসম্পদের কাছাকাছি জায়গায় ডেটা সেন্টার তৈরি করা হলে দীর্ঘমেয়াদে খরচ ও পরিবেশগত চাপ দুটোই কমানো সম্ভব।

কলকাতা-সহ নতুন শহরগুলির দিকে নজর

এতদিন ভারতের ডেটা সেন্টার শিল্পের বড় অংশ মুম্বই, দিল্লি, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ ও চেন্নাইয়ের মতো বড় শহরকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু বিদ্যুৎ, জমি ও পরিকাঠামোর চাপ বাড়ায় নতুন জায়গার সন্ধান শুরু হয়েছে।

সরকারি তথ্যেও অন্ধ্রপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগঢ় এবং পশ্চিমবঙ্গ-সহ কয়েকটি রাজ্যকে নতুন ডেটা সেন্টার বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর ফলে কলকাতার মতো শহরও ভবিষ্যতের AI পরিকাঠামোর মানচিত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে তার জন্য নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ, উচ্চগতির নেটওয়ার্ক, জমি, দক্ষ কর্মী এবং পরিবেশবান্ধব কুলিং ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে।

বিনিয়োগের বড় সুযোগ

AI-এর প্রসার ডেটা সেন্টার শিল্পের পাশাপাশি বিদ্যুৎ, কুলিং, নেটওয়ার্কিং, চিপ, নির্মাণ এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি — একাধিক ক্ষেত্রের ব্যবসার সুযোগ বাড়াচ্ছে। KPMG-র বিশ্লেষণেও ভারতের ডেটা সেন্টার ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। তুলনামূলক কম নির্মাণ খরচ, প্রতিযোগিতামূলক বিদ্যুৎ এবং দক্ষ মানবসম্পদের মতো বিষয় ভারতের আকর্ষণ বাড়াচ্ছে।

একই সঙ্গে Microsoft-সহ বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলি ভারতের ক্লাউড ও AI পরিকাঠামো সম্প্রসারণ করছে। Microsoft সম্প্রতি ভারতে নতুন ডেটা সেন্টার অঞ্চল চালু করেছে, যা দেশের AI ও ক্লাউড অর্থনীতির বৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, AI-এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু শক্তিশালী চিপ বা উন্নত সফটওয়্যারের উপর নয়। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, দক্ষ কুলিং, নির্ভরযোগ্য নেটওয়ার্ক এবং পরিবেশবান্ধব পরিকাঠামো তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের সামনে তাই একই সঙ্গে রয়েছে বড় সুযোগ এবং বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে AI-নির্ভর অর্থনীতি দেশে নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে অপরিকল্পিত ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণ বিদ্যুৎ ও জলসম্পদের উপর চাপ বাড়াতে পারে।

ফলে আগামী দিনের প্রতিযোগিতা শুধু কে সবচেয়ে বড় AI ডেটা সেন্টার তৈরি করতে পারবে, তা নিয়ে হবে না। বরং কে কম বিদ্যুৎ ও কম সম্পদ ব্যবহার করে বেশি কম্পিউটিং ক্ষমতা দিতে পারবে, সেই প্রশ্নই প্রযুক্তি শিল্পে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -