ভারত সরকার পান মশলার প্যাকেজিংয়ে প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল ও প্লাস্টিক-ল্যামিনেট ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। FSSAI-এর নতুন নিয়ম অনুযায়ী, পান মশলা প্যাকেটজাত করতে কাগজ, পেপারবোর্ড, সেলুলোজ, টিন বা কাচের মতো বিকল্প উপাদান ব্যবহার করতে হবে। তবে পান মশলা নিষিদ্ধ হয়নি; শুধুমাত্র এর প্যাকেজিং ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন নিয়মে প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলির উৎপাদন ও প্যাকেজিং ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে।

পান মশলার প্যাকেজিং ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনল ভারত সরকার। এবার থেকে পান মশলা প্যাকেটজাত করার ক্ষেত্রে প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল এবং বিভিন্ন ধরনের সিন্থেটিক বা প্লাস্টিক-ল্যামিনেটেড উপাদান ব্যবহার করা যাবে না। Food Safety and Standards Authority of India (FSSAI)-এর নতুন সংশোধিত নিয়মে পান মশলার জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে কোন ধরনের প্যাকেজিং উপাদান ব্যবহার করা যাবে এবং কোনগুলি নিষিদ্ধ।
নতুন নিয়মের ফলে এতদিন বাজারে বহুল ব্যবহৃত ছোট প্লাস্টিকের পাউচ বা মাল্টি-লেয়ার প্যাকেটের ব্যবহার বন্ধ হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে। পরিবর্তে কাগজ, পেপারবোর্ড, সেলুলোজ বা অন্যান্য প্রাকৃতিক উৎস থেকে তৈরি উপাদান এবং টিন বা কাচের পাত্র ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে কাগজ বা প্রাকৃতিক উপাদানের প্যাকেটের মধ্যেও কোনও ধরনের প্লাস্টিক বা নিষিদ্ধ সিন্থেটিক স্তর রাখা যাবে না।
পান মশলার প্যাকেটে কী কী নিষিদ্ধ?
FSSAI-এর সংশোধিত প্যাকেজিং বিধিতে পান মশলার ক্ষেত্রে প্লাস্টিক-ভিত্তিক বিভিন্ন উপাদানের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পলিথিন, পলিপ্রোপিলিন, পলিয়েস্টার, PVC-সহ বিভিন্ন সিন্থেটিক পলিমার ও কো-পলিমার। প্লাস্টিক ল্যামিনেটও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে।
শুধু প্লাস্টিক নয়, অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল এবং মেটালাইজড স্তর ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ফলে বাইরে কাগজের মতো দেখতে হলেও ভিতরে প্লাস্টিক বা মেটালাইজড স্তরযুক্ত প্রচলিত প্যাকেট নতুন নিয়মে গ্রহণযোগ্য হবে না।
এই পরিবর্তনটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বর্তমানে পান মশলার বড় অংশই ছোট, হালকা এবং বহুস্তরীয় পাউচে বাজারজাত করা হয়। নতুন বিধি কার্যকর হওয়ায় এই প্রচলিত প্যাকেজিং পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আনতে হবে প্রস্তুতকারকদের।
কোন প্যাকেটে এবার পান মশলা বিক্রি করা যাবে?
নতুন নিয়মে পান মশলার জন্য প্লাস্টিকমুক্ত প্যাকেজিংয়ের কয়েকটি বিকল্প রাখা হয়েছে। কাগজ, পেপারবোর্ড, সেলুলোজ এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক উৎস থেকে তৈরি উপাদান ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সেই প্যাকেজিং সম্পূর্ণভাবে প্লাস্টিক ও নিষিদ্ধ সিন্থেটিক উপাদানমুক্ত হতে হবে।
এর পাশাপাশি টিন ও কাচের পাত্রেও পান মশলা প্যাক করা যাবে। অর্থাৎ প্রস্তুতকারকদের সামনে একাধিক বিকল্প থাকলেও সেগুলির মূল শর্ত হল — প্যাকেজিংয়ের মধ্যে নিষিদ্ধ প্লাস্টিক বা সিন্থেটিক ল্যামিনেট থাকা যাবে না।
কেন এই সিদ্ধান্ত?
পান মশলার ছোট পাউচ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অল্প পরিমাণ পণ্য প্যাক করতে ব্যবহৃত এই ধরনের পাউচ ব্যবহারের পর দ্রুত ফেলে দেওয়া হয়। ফলে বিপুল সংখ্যক ছোট প্যাকেট বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে।
নতুন নিয়মের অন্যতম লক্ষ্য হল পান মশলার প্যাকেজিংয়ে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং তুলনামূলকভাবে পরিবেশবান্ধব বিকল্পের ব্যবহার বাড়ানো। FSSAI-এর নতুন বিধি পান মশলাকে Food Safety and Standards (Packaging) Regulations, 2018-এর Schedule 4-এ নির্দিষ্ট প্যাকেজিং সংক্রান্ত বিধানের আওতায় এনেছে।
তবে এটিকে শুধুমাত্র পরিবেশগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। খাদ্যপণ্যের প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত উপাদান যাতে পণ্যের নিরাপত্তা ও গুণমানের উপর নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, সেটিও খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নতুন নিয়ম কি পান মশলা নিষিদ্ধ করছে?
এই প্রশ্নটি নিয়ে ইতিমধ্যেই অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। না, নতুন নিয়মে পান মশলা নিষিদ্ধ করা হয়নি। FSSAI-এর সিদ্ধান্তটি পান মশলা উৎপাদন বা বিক্রির উপর সাধারণ নিষেধাজ্ঞা নয়। পরিবর্তনটি মূলত পান মশলা কীভাবে প্যাকেটজাত করা যাবে, সেই সংক্রান্ত। অর্থাৎ পান মশলা বাজারে বিক্রি হতে পারে, কিন্তু তার প্যাকেজিংয়ের জন্য নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলতে হবে।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ‘পান মশলা নিষিদ্ধ’ এবং ‘পান মশলার প্লাস্টিক প্যাকেজিং নিষিদ্ধ’ — দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলির উপর কী প্রভাব পড়বে?
নতুন বিধির ফলে পান মশলা প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলিকে তাদের বর্তমান প্যাকেজিং ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে হতে পারে। বিশেষ করে যেসব সংস্থা প্লাস্টিক বা প্লাস্টিক-ল্যামিনেটেড পাউচের উপর নির্ভরশীল, তাদের বিকল্প প্যাকেজিং প্রযুক্তি ও উপাদান ব্যবহার করতে হবে।
এর প্রভাব পড়তে পারে প্যাকেটের নকশা, উৎপাদন ব্যবস্থা, প্যাকেজিং যন্ত্রপাতি, পরিবহণ এবং সংরক্ষণ পদ্ধতির উপরও। নতুন উপাদান ব্যবহারের ফলে উৎপাদন খরচ কতটা বাড়বে, সেটি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সংস্থা কী ধরনের বিকল্প প্যাকেজিং বেছে নিচ্ছে তার উপর।
এখনই অবশ্য সব পান মশলার খুচরা দাম বাড়বে—এমন কোনও সরকারি ঘোষণা নেই। তাই প্যাকেজিং পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দাম বৃদ্ধির বিষয়টিকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে দেখার কারণ নেই।
কবে থেকে কার্যকর হল নতুন বিধি?
FSSAI ২০২৬ সালের শুরুতেই পান মশলার প্যাকেজিং সংক্রান্ত পরিবর্তনের জন্য খসড়া বিধি প্রকাশ করেছিল এবং সংশ্লিষ্ট মহলের কাছ থেকে মতামত ও আপত্তি আহ্বান করেছিল। পরে প্রাপ্ত মতামত বিবেচনা করে চূড়ান্ত সংশোধিত বিধি প্রকাশ করা হয়। FSSAI-এর নিজস্ব ওয়েবসাইটেও ২০২৬ সালে পান মশলার প্যাকেজিং উপাদানের তালিকা সংক্রান্ত সংশোধনের খসড়া প্রকাশের তথ্য রয়েছে।
সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, চূড়ান্ত নিয়ম প্রকাশের পরই পান মশলার প্যাকেজিং নিয়ে নতুন বাধ্যবাধকতা কার্যকর হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট প্রস্তুতকারকদের এখন নতুন নিয়ম মেনে প্যাকেজিং ব্যবস্থা সাজাতে হবে।
বাজারে কী পরিবর্তন দেখা যেতে পারে?
নতুন নিয়ম বাস্তবায়িত হলে আগামী দিনে পান মশলার প্যাকেটের চেহারায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। ছোট প্লাস্টিক পাউচের পরিবর্তে কাগজভিত্তিক বা প্রাকৃতিক উপাদানের প্যাকেজিং বাড়তে পারে। পাশাপাশি টিন ও কাচের পাত্রের ব্যবহারও কিছু ক্ষেত্রে বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে কাগজভিত্তিক প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে পণ্যের আর্দ্রতা, গন্ধ, সংরক্ষণক্ষমতা এবং পরিবহণের সময় প্যাকেটের স্থায়িত্ব বজায় রাখা। তাই প্রস্তুতকারকদের এমন প্রযুক্তি বেছে নিতে হবে, যাতে একদিকে নতুন বিধি মানা যায় এবং অন্যদিকে পণ্যের গুণমানও বজায় থাকে।
পরিবেশের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ এই পদক্ষেপ?
পান মশলার ছোট প্যাকেটের সংখ্যা বিপুল হওয়ায় প্লাস্টিকমুক্ত প্যাকেজিংয়ের দিকে এই পরিবর্তন বর্জ্য কমানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে এমন প্যাকেজিং, যা ব্যবহারের পর পুনর্ব্যবহার বা তুলনামূলকভাবে সহজে ব্যবস্থাপনা করা যায়, তা দীর্ঘমেয়াদে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উপর চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
তবে এই উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে নিয়মের বাস্তব প্রয়োগ, বাজারে নজরদারি এবং প্রস্তুতকারকদের নিয়ম মেনে চলার উপর।
সব মিলিয়ে, পান মশলার প্যাকেটে প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করার FSSAI-এর নতুন নিয়ম ভারতের প্যাকেজিং শিল্পে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পান মশলা নিষিদ্ধ না হলেও এর প্রচলিত প্লাস্টিক প্যাকেজিং ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে চলেছে। আগামী দিনে বাজারে কাগজ, প্রাকৃতিক উপাদান, টিন ও কাচের প্যাকেট কতটা জায়গা করে নেয় এবং প্রস্তুতকারকরা নতুন নিয়মের সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নেন, সেটিই এখন নজরে থাকবে।

