ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বৈধ মোটরযান বিমা নিশ্চিত করতে ‘নো ইন্স্যুরেন্স, নো ফুয়েল’ নীতির একটি পাইলট প্রকল্পের সুপারিশ করেছে। তবে এটি এখনও সারা দেশে কার্যকর কোনও আইন নয়। আদালত কেন্দ্র সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলিকে সম্ভাব্য বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরির নির্দেশ দিয়েছে। বর্তমানে বৈধ বিমা না থাকলেও জ্বালানি সরবরাহে জাতীয় পর্যায়ে কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই।

দেশের সড়কে বিপুল সংখ্যক বিমাবিহীন যানবাহনের চলাচল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। এই পরিস্থিতিতে বৈধ মোটরযান বিমা নিশ্চিত করতে ‘নো ইন্স্যুরেন্স, নো ফুয়েল’ বা বৈধ বিমা না থাকলে জ্বালানি না দেওয়ার একটি সম্ভাব্য ব্যবস্থা নিয়ে পাইলট প্রকল্প তৈরির সুপারিশ করেছে শীর্ষ আদালত। তবে আদালতের এই পর্যবেক্ষণকে ঘিরে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হলেও, বর্তমানে সারা দেশে এমন কোনও আইন কার্যকর হয়নি।
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশের রাস্তায় চলাচলকারী বিপুল সংখ্যক মোটরযানের বৈধ থার্ড-পার্টি বিমা নেই। অথচ মোটরযান আইনের অধীনে জনসাধারণের রাস্তায় চলাচলকারী প্রতিটি মোটরযানের জন্য থার্ড-পার্টি বিমা বাধ্যতামূলক। দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা পরিবারের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই এই বিধান রাখা হয়েছে।
আদালত মনে করছে, বিমাবিহীন যানবাহনের সংখ্যা কমাতে এবং আইন মেনে চলার প্রবণতা বাড়াতে নতুন প্রযুক্তিনির্ভর পদক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে। সেই কারণেই কেন্দ্র সরকার, বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইআরডিএআই (IRDAI) এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একটি পাইলট প্রকল্পের সম্ভাব্য রূপরেখা তৈরির বিষয়ে বিবেচনা করতে বলা হয়েছে। এই প্রকল্পে বৈধ বিমা ছাড়া কোনও গাড়িকে পেট্রোল বা ডিজেল সরবরাহ না করার ব্যবস্থা কার্যকর করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
তবে আদালতের পর্যবেক্ষণের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই দাবি করেন, এখন থেকে বিমা না থাকলে কোনও পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি পাওয়া যাবে না। বাস্তবে এই দাবি সঠিক নয়। বর্তমানে দেশের কোথাও এই নীতি বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর করা হয়নি। আদালত কেবল একটি সম্ভাব্য নীতি নিয়ে পরীক্ষামূলক উদ্যোগ গ্রহণের সুপারিশ করেছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণকে কার্যকর করতে হলে কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রশাসনিক নির্দেশিকা, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং প্রয়োজন হলে আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি পেট্রোল পাম্পগুলিতে এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনও গাড়ির নিবন্ধন নম্বরের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিকভাবে বিমার বৈধতা যাচাই করা সম্ভব হয়। এসব প্রস্তুতি ছাড়া এই ধরনের ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ভবিষ্যতে এই নীতি চালু হয়, তাহলে গাড়ির মালিকদের মধ্যে সময়মতো বিমা নবীকরণের প্রবণতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কারণ, বৈধ থার্ড-পার্টি বিমা থাকলে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষতিপূরণ দাবি করা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়।
অন্যদিকে, কিছু মহল এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একাধিক চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার পেট্রোল পাম্পে প্রযুক্তিগত সংযোগ, তথ্যভান্ডারের তাৎক্ষণিক আপডেট, সার্ভারের নির্ভরযোগ্যতা এবং ভুল তথ্যের কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া কোনও গাড়ির বিমা নবীকরণ হওয়ার পর সেই তথ্য কত দ্রুত কেন্দ্রীয় ডাটাবেসে প্রতিফলিত হবে, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করার পরিবর্তে ডিজিটাল যাচাই ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় স্মারক বার্তা, অনলাইন বিমা নবীকরণ এবং সচেতনতামূলক প্রচার বাড়ানোও কার্যকর হতে পারে। এতে আইন মেনে চলার প্রবণতা বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপও কম পড়বে।
বর্তমানে মোটরযান মালিকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল — গাড়ির বৈধ নথিপত্র, যেমন নিবন্ধন শংসাপত্র (RC), দূষণ নিয়ন্ত্রণ শংসাপত্র (PUC), ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং থার্ড-পার্টি বিমা যথাসময়ে নবীকরণ করা। কারণ বিদ্যমান আইন অনুযায়ী বৈধ বিমা ছাড়া জনসাধারণের রাস্তায় গাড়ি চালানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
সব মিলিয়ে, ‘নো ইন্স্যুরেন্স, নো ফুয়েল’ নীতি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ সড়ক নিরাপত্তা ও মোটরযান বিমা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার একটি সম্ভাব্য উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এটি এখনও প্রস্তাব বা পাইলট প্রকল্পের পর্যায়ে রয়েছে। সরকার ভবিষ্যতে কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং পরীক্ষামূলক প্রকল্পের ফলাফল কী হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে এই নীতি আদৌ সারা দেশে কার্যকর হবে কি না।
(বিঃ দ্রঃ : এই প্রতিবেদনটি সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি আলোচনার ভিত্তিতে প্রস্তুত। বর্তমানে সারা দেশে ‘বিমা না থাকলে পেট্রোল দেওয়া হবে না’ — এমন কোনও বাধ্যতামূলক নিয়ম কার্যকর হয়নি।)

